by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
আমার পড়াশোনা শুরু থেকেই বিজ্ঞানবিভাগে। ম্যানেজমেন্টের উপর নামকা ওয়াস্তে একটা অখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই ‘হালকার উপর ঝাপসা’মানের একটা MBA ডিগ্রী আছে। তাও সেটার সার্টিফিকেট গত একযুগ ধরে পড়ে আছে সেই ইউনিভার্সিটির কোন এক জং ধরা ক্যাবিনেটে ; আমার সুবিখ্যাত আলস্যের কারণে ওটা আর তুলতেও যাই নি
তো ‘Trial and Error’ , সেই বিখ্যাত মৌলিক পদ্ধতিতে আমার ম্যানেজমেন্ট শেখার হাতেখড়ি । প্রতিমুহূর্তেই শেখার আবশ্যকতা আছে এবং জীবন্ত মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে যা হয়–একজনের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, আরেকজনের ক্ষেত্রে সেটা ভীষণভাবে ব্যর্থ ! সবকিছু বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত ‘Situational Leadership’ বা ‘Situational Management’ সবগুলোর একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়েছে।
আরেকটা ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি খুব কার্যকর, বহুল প্রচলিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় আমাদের দেশে । ম্যানেজমেন্টের ভাষায় এটাকে Autocratic Management বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমি এটার নাম দিয়েছি Spider Management বা ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’।
ধরুন , একজন মেধাবী লোক একটা কোম্পানির মালিক অথবা একজন সিইও বা ম্যানেজার। তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই। এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই আছেন এবং ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে বাকী লোকেরা তার চেয়ে কম মেধাবী। এবং যে কোন পরিপ্রেক্ষিতে অন্যকেউ যেই সিদ্ধান্তই দিক না কেন, ঐ মেধাবী মালিকের বা ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত পরীক্ষিতভাবে সবচেয়ে কার্যকর !
তো, হয় কী , ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের সবধরনের সিদ্ধান্তের একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে বসেন তিনি ! এক পর্যায়ে দেখা যায় রিসিপশনের চেয়ার টেবিলের রং , কার্পেট , কাপ-পিরিচ থেকে টয়লেটের কমোড কেনার সিদ্ধান্তও তাকে দিতে হয়। সকলেই ব্যাপারটাকে মেনে নেয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। কোম্পানির সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্য ব্যক্তিটিকে এককভাবে সাধুবাদ দেওয়া হয়। আর ঐ ব্যক্তি নিজেকে ধীরে ধীরে কোম্পানির অন্যান্য আসবাবপত্রের মতো নিজেকে অপরিহার্য করে ফেলে।
ব্যাপারটা মাকড়শার মতো অনেকটা। একটা মাকড়শা তার জালের ঠিক কেন্দ্রে থেকে মুখ দিয়ে , পেট দিয়ে , হাত দিয়ে পা দিয়ে চারপাশ আঁকড়ে থাকে। অনেক সময় সেই স্কুলপাঠ্যের লোভী স্বার্থপর মাকড়শার মতো হয়, চারদিকের টানে নিজেকে একসময় ছিঁড়েখুঁড়ে ধ্বংস করে ফেলে সে। কর্মজীবনে এই মাকড়শা মালিক বা ম্যানেজারদের মুখোমুখি হতেই হবে আপনাকে। আমাদের চারপাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যানেজাররাই এই পদ্ধতিতে চলতে চান। কেন চান , সে গল্প আরেকদিন হবে।
দীর্ঘমেয়াদি মুশকিল হয় অন্যখানে। একজন মানুষ যতো দক্ষ বা সিদ্ধান্তগ্রহণে পারঙ্গম হন না কেন; সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার গুণগত মান কমতে থাকে। একজন দক্ষ ডাক্তার দিনে একটা অপারেশন করলে যে গুণগত মান পাওয়া যাবে ; ১০টা করলে সেক্ষেত্রে ছোটখাটো বা বড় ধরণের ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ! যে মালিক বা ম্যানেজার সপ্তাহে ১০টি বড় ধরণের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, ধরে নিচ্ছি তার এফিসিয়েন্সির মান শতকরা ৯৫ ভাগ। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন ১০০ টা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন বা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তার এফিসিয়েন্সি কমে যাচ্ছে । ধরুন, তা নেমে হয়ে গেল ৯০ ভাগে। এখন ২০০টি সিদ্ধান্ত হলে, ২০টি দুর্বল সিদ্ধান্ত বা ভুল সিদ্ধান্ত অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের জন্য বা কর্মচারীদের জন্য নিদারুণ ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু এই দুষ্টচক্র থেকে ঐ ব্যক্তি বের হয়ে আসতে পারেন না কোনভাবেই। নিজের জালে নিজে এমনভাবে আটকে যান যে– না পারেন ছিঁড়তে, না পারেন বের হতে, না পারেন কাউকে বলতে। নিজের পরিবারপরিজন থেকে ধীরে ধীরে সরে যান ; পরিবারও তাকে ছাড়া দিব্যি চলতে শিখে যায়।
আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’ ছোট প্রতিষ্ঠানের উত্থানের জন্য দারুণ কার্যকর একটা পদ্ধতি। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান যখন ২০ জন থেকে ২০০ বা ২০০০ জনের হয়ে যায় ; তখন তা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, সেটা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, দুইজনের জন্য চরম অমঙ্গলকর !
[ প্রকাশকালঃ ২৩শে সেপ্টেম্বর , ২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
১। কর্পোরেট দুনিয়ায় আপনাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেষ্টা করে যেতে হবে। সমান পরিশ্রমী হলেও , এক শ্রেণী আছে যারা ডিমপাড়া মুরগীর মতো প্রতিটি প্রাত্যহিক ডিম-প্রসবের পরপরই সমস্ত কোম্পানির মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে, ড্রাইভার –দারোয়ানদেরকেওকে জানিয়ে দেয় সদ্যই ডিম পাড়া হয়েছে। পাইপলাইনে আরো ডিম আছে। এরা একটা এক্সট্রিম শ্রেণী। মধ্যপন্থীদের কথা বাদ দিলে — আরেকদল নরমপন্থী আছে যারা ডিম পেড়ে খাঁচা ভরে যাওয়ার অপেক্ষা করে । ভাবতে থাকে , এটাতো তার দায়িত্বই ছিল। একইসঙ্গে তাঁরা এই আশাবাদও পোষণ করতে থাকে–উর্ধ্বতনেরা এসে তাঁকে সাধুবাদ জানাবে ! আফসোস –Everybody cares about barking dogs ; either it bites or not !
২। বহুবহু বছর আগে কথা ! আমাদের এক সতীর্থ বন্ধুর প্রথম চাকরি ও টাইটেলের কাহিনী। আমরা সদ্য পরীক্ষা শেষে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছি ; সেই সময়ে সে খোঁজ দিল তার চাকরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জের একটা নিট কম্পোজিটে। টেক্সটাইল কারখানায় সেই সময়ে ওপেনিং পজিশন ছিল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার। সে তার ভিজিটিং কার্ড দেখালো , টাইটেল হচ্ছে ED ( এক্সিকিউটিভ ডিরেকটর )! আমরা সবাই বিস্ময়ে হতবাক ও মনেমনে মর্মাহত ! ক্যাম্নে কি ? জিজ্ঞাসাবাদে সে বের হল, মালিক তেমন শিক্ষিত না । ভিজিটিং কার্ডে কি টাইটেল লিখবে সেটা জিজ্ঞাস করায়, মালিক নাকি উত্তর দিয়েছে, ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছাড়া যে কোন একটা কিছু লিখে নিতে ! বন্ধু আমার প্রথম চাকরিতেই এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর !
ভুলে যাবেন না, কর্পোরেট চাকরির হচ্ছে পিরামিডের মতো, উর্ধ্বমুখী টাইটেল ও বেতনের সাথে সাথে পিরামিডের উপরের দিকে নড়াচড়ার পথ সরু হয়ে যায় ! একটা টাইটেল নিতেই পারেন বা পেতেই পারেন, কিন্তু ওই টাইটেলে কেউ নিজেকে যদি আমার সেই বন্ধুটির মতো করে ফেলেন, তাহলেই মারা !
৩। প্রায়শঃ দীর্ঘদিনের কর্মচারীদের ধারণা হয় যে, মালিকরা মনে হয় তাঁদেরকে পরিবারের মত ভাবে ! কোন কারণে পুরাতন কর্মচারীরা উর্ধতনদের উপরে ক্ষুদ্ধ, অভিমানী হয়ে পড়লে সে আশা করে বসে, ব্যাপারটা হয়তো সমানুপাতিকভাবে উর্ধ্বতন বা মালিকপক্ষকেও চিন্তিত করছে। বাস্তবতা হচ্ছে—না করছে না ! আপনি কর্মচারী হলে আপনার কোন একটা বঞ্চনার অভিমান নিয়ে আপনি দিনে দশবার চিন্তা করতেই পারেন, মালিকের কিন্তু অতখানি সময় নেই সেটা সপ্তাহে বা মাসে একবার চিন্তা করার ! সুতরাং স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান যদি হয় সমানুপাতিক , তবে মালিক কর্মচারীর মান-অভিমানের টানাপোড়েন বিপরীতভাবে ব্যস্তানুপাতিক।
৪। প্রতিটি শাশুড়ি ভুলে যান তাঁরা একসময় বৌমা ছিলেন ! ঠিক যে ব্যবহার তিনি পেয়েছেন, মনে মনে ভাবেন তিনি ভালো শাশুড়ি হবেন । কিন্তু যা হওয়ার তাই হয় ! উনি তার শাশুড়ির চেয়েও একপ্রস্থ নিম্নগামী হন ! অনেক নতুন মালিক বা ম্যানেজারদের সমস্যা তাঁরা চিন্তায় পড়ে যান , তাদের অধীনস্থদের সাথে কী ধরণের ব্যবহার করবেন? আসলে ঠিক সেই ব্যবহারটাই করা উচিৎ , যেটা আপনি আপনার উচ্চপদস্থদের কাছ থেকে আশা করে থাকেন। সময়মত আপনার অধীনস্থকে যেমন প্রশংসাও করতে হবে আবার তিরস্কারে সময় তিরস্কারও ।
অন্যদিকে , নতুন কর্মচারী হিসাবে আপনি কি ধরণের আচরণ করবেন উর্ধ্বতনের সাথে ? সহজ উত্তর, আপনি আপনার অধীনস্থদের কাছ থেকে যে রকমটি আশা করেন সেটাই ! আপনি নিজেওতো হালকা তেলের সাথে আপডেট থাকতে ও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালোবাসেন। কয়েকজনের মাঝে যে আপনাকে সবসময় আপডেট দেয়, তাঁকেই তো আপনার পছন্দ। যে অধীনস্থ আপনাকে প্রশংসা করে, তার ব্যাপারে সুনজর আছে আপনার । যে কর্মচারী আগ বাড়িয়ে সালাম দেয় , সে আপনার ঘনিষ্ঠ ! তো আপনাকেও ঠিক সেই কাজগুলিই করতে হবে , যেটা আপনি নিজেও পছন্দ করেন !
৫। কিছু বস আছে , অধীনস্থদের দৌড়ের উপরে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একটা ই-মেইল ডাউনলোড হওয়ার আগেই , সে আপনাকে ফলোআপ করা শুরু করে। সেইসব বসকে ‘বশ’ করার জন্য আমার একটা আলাদা নিয়ম ছিল। নিতান্তই ঠেকায় পড়ে আবিষ্কার করতে হয়েছিল। সাধারণত এই শ্রেণির বসেরা কমফোর্ট জোনে থাকতে চায়,আপডেটেড থাকতে চায়; একটা কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে না, নিজেও টেনশন করতে থাকে। তো, এই শ্রেণীর বস , ক্ষণে ক্ষণে খবর নেয়, কি অবস্থা ,কতদূর ? এদেরকে ঠান্ডা রাখতে হলে , নিয়মিত ইনফর্মেশন দিতে হয়। এবং ইনফর্মেশন ওভারফিড (overfeed ) করতে হয়। আপনি গত কয়েক ঘন্টায় কী কী করেছেন এবং আগামী কয়েকঘন্টায় কী কী করবেন তা যদি নিয়মিত প্রতিদিন রুটিন করে জানাতে থাকেন, মাস দুয়েকের মধ্যেই আপনার বস আপনার ব্যাপারে পুরোপুরি আস্থাশীল হয়ে উঠবেন, আপনার ঘাড়ের কাছে সারাক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলে বার বার কাজের অগ্রগতির কথা জানতে চাইবেন না
প্রকাশকালঃ ২রা আগস্ট,২০১৬
by Jahid | Nov 23, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
ভালো ছাত্র মানেই ভালো শিক্ষক নয় এবং সকল ভালো শিক্ষক যে ভালো ছাত্র ছিলেন তাও না। আমাদের দেশে দক্ষ কর্মীরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দক্ষ ম্যানেজার হতে পারছেন না। কারণ কী ? মনে করেন একটা ছেলে দারুণ দক্ষ অপারেটর/কর্মী , যেই না তাঁকে সুপারভাইজার করে দেওয়া হচ্ছে , সে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী দক্ষতা দেখাতে পারছে না।
মুশকিল হচ্ছে , সে তখন না পারছে তার নিজস্ব কাজের দক্ষতা দেখাতে ; না পারছে অন্যকে সুপারভাইজ/ম্যানেজ করতে। এই কমতি তাকে পূরণ করতে হচ্ছে আদিম পদ্ধতির ‘বসিং’ করে , হুমহাম-হৈচৈ করে। অনেকেই তাঁদের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা , ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতিতে ধাক্কা খেতে খেতে সঠিক ব্যবস্থাপনা শিখছেন; কেউ বা শেখার অনাগ্রহ ও নানা ইজমের ফাঁকে পড়ে এক পজিশনে ঘষাঘষি করছেন।
আসলে , বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মচারীদের নিয়মিত কোন স্কিল বেইজড ট্রেনিং নেই । কোন প্রিপারেশন ছাড়াই একজন কর্মীকে ম্যানেজার বানিয়ে সম্মুখসমরে দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধে পাঠাচ্ছি অথচ প্রয়োজনীয় অস্ত্র-রসদ কিছুই দিচ্ছি না; এবং আশা করছি সে যুদ্ধে জিতে আসবে !
আবার , ডেলিগেশন বলে একটা ইংরেজি শব্দ আছে, যেটা আমাদের বার্ধক্যপীড়িত প্রাচীন ম্যানেজাররা জানেন না। তাদের ধারণা নিজের কাজের দক্ষতা অন্যকে শিখিয়ে দিলে তো তার চাকরি নড়বড়ে হয়ে যাবে। সুতরাং তারা তাদের অভিজ্ঞতা অধীনস্থদের দিতে পারছেন বা দিতে চাচ্ছেন না ।
এই দুষ্টচক্রে পড়ে নতুন প্রজন্মকে সেই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতি দিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য কর্মঘণ্টা নষ্ট করে সুপারভাইজ বা ম্যানেজমেন্ট শিখতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য