জীবনস্মৃতি । মৃত্যুশোক। রবীন্দ্র-রচনাবলী , খণ্ড ১৭ (বিশ্বভারতী , ১৩৫০)

ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যুঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অল্প। [{ সারদাদেবীর মৃত্যু, ১২৮১, ২৫ ফাল্গুন, [১৮৭৫, ৮ মার্চ]— র-কথা ]} অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়— তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে!” তখনই বউঠাকুরানী [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন— পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না;— সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর-দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম— তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।

বাড়িতে যিনি কনিষ্ঠা বধূ [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} ছিলেন তিনিই মাতৃহীন বালকদের ভার লইলেন। তিনিই আমাদিগকে খাওয়াইয়া পরাইয়া সর্বদা কাছে টানিয়া, আমাদের যে কোনো অভাব ঘটিয়াছে তাহা ভুলাইয়া রাখিবার জন্য দিনরাত্রি চেষ্টা করিলেন। যে-ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে-বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ;— শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীরভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না। এইজন্য জীবনে প্রথম যে-মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতোই একদিন নিঃশব্দপদে চলিয়া গেল। ইহার পরে বড়ো হইলে যখন বসন্তপ্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম— তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত;— আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম যে-স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুলগুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে; জগতে তাহার আর অন্ত নাই— তা আমরা ভুলিই আর মনে রাখি।

কিন্তু আমার চব্বিশবছর বয়সের সময় মৃত্যুর [{ ↓কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু, ১২৯১, ৮ বৈশাখ [১৮৮৪, ১৯ এপ্রিল]— রবীন্দ্র-জীবনী ১, পৃ ১৫০↓]} সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়েসের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়— কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।

জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর-কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমনসময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। চারিদিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল— এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া! [{ ↓তুমি কোথায় (ভারতী, ১২৯১ পৌষ), কড়ি ও কোমল, রচনাবলী ২ ‘পুষ্পাঞ্জলি (ভারতী, ১২৯২ বৈশাখ) এবং ‘প্রথম শোক’ (‘কথিকা’, সবুজপত্র, ১৩২৬ আষাঢ়), লিপিকা↓]}

জীবনের এই রন্ধ্রটির ভিতর দিয়া যে একটা অতলস্পর্শ অন্ধকার প্রকাশিত হইয়া পড়িল, তাহাই আমাকে দিনরাত্রি আকর্ষণ করিতে লাগিল। আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবল সেইখানে আসিয়া দাঁড়াই, সেই অন্ধকারের দিকেই তাকাই এবং খুঁজিতে থাকি— যাহা গেল তাহার পরিবর্তে কী আছে। শূন্যতাকে মানুষ কোনোমতেই অন্তরের সঙ্গে বিশ্বাস করিতে পারে না। যাহা নাই তাহাই মিথ্যা, যাহা মিথ্যা তাহা নাই। এইজন্যই যাহা দেখিতেছি না তাহার মধ্যে দেখিবার চেষ্টা, যাহা পাইতেছি না তাহার মধ্যেই পাইবার সন্ধান কিছুতেই থামিতে চায় না। চারাগাছকে অন্ধকার বেড়ার মধ্যে ঘিরিয়া রাখিলে, তাহার সমস্ত চেষ্টা যেমন সেই অন্ধকারকে কোনোমতে ছাড়াইয়া আলোকে মাথা তুলিবার জন্য পদাঙ্গুলিতে ভর করিয়া যথাসম্ভব খাড়া হইয়া উঠিতে থাকে— তেমনি, মৃত্যু যখন মনের চারিদিকে হঠাৎ একটা ‘নাই’-অন্ধকারের বেড়া গাড়িয়া দিল, তখন সমস্ত মনপ্রাণ অহোরাত্র দুঃসাধ্য চেষ্টায় তাহারই ভিতর দিয়া কেবলই ‘আছে’-আলোকের মধ্যে বাহির হইতে চাহিল। কিন্তু সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে।

তবু এই দুঃসহ দুঃখের ভিতর দিয়া আমার মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে একটা আকস্মিক আনন্দের হাওয়া বহিতে লাগিল, তাহাতে আমি নিজেই আশ্চর্য হইতাম। জীবন যে একেবারে অবিচলিত নিশ্চিত নহে, এই দুঃখের সংবাদেই মনের ভার লঘু হইয়া গেল। আমরা যে নিশ্চল সত্যের পাথরে-গাঁথা দেয়ালের মধ্যে চিরদিনের কয়েদি নহি, এই চিন্তায় আমি ভিতরে ভিতরে উল্লাস বোধ করিতে লাগিলাম। যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটাকে ক্ষতির দিক দিয়া দেখিয়া যেমন বেদনা পাইলাম তেমনি সেইক্ষণেই ইহাকে মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ করিলাম। সংসারের বিশ্বব্যাপী অতি বিপুল ভার জীবনমৃত্যুর হরণপূরণে আপনাকে আপনি সহজেই নিয়মিত করিয়া চারিদিকে কেবলই প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে, সে-ভার বদ্ধ হইয়া কাহাকেও কোনোখানে চাপিয়া রাখিয়া দিবে না— একেশ্বর জীবনের দৌরাত্ম্য কাহাকেও বহন করিতে হইবে না— এই কথাটা একটা আশ্চর্য নূতন সত্যের মতো আমি সেদিন যেন প্রথম উপলব্ধি করিয়াছিলাম।

সেই বৈরাগ্যের ভিতর দিয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও গভীররূপে রমণীয় হইয়া উঠিয়াছিল। কিছুদিনের জন্য জীবনের প্রতি আমার অন্ধ আসক্তি একেবারেই চলিয়া গিয়াছিল বলিয়াই, চারিদিকে আলোকিত নীল আকাশের মধ্যে গাছপালার আন্দোলন আমার অশ্রুধৌত চক্ষে ভারি একটি মাধুরী বর্ষণ করিত। জগতকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে-দূরত্বের প্রয়োজন মৃত্যু সেই দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম তাহা বড়ো মনোহর।

সেই সময়ে আবার কিছুকালের জন্য আমার একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ দেখা দিয়াছিল। সংসারের লোকলৌকিকতাকে নিরতিশয় সত্য পদার্থের মতো মনে করিয়া তাহাকে সদাসর্বদা মানিয়া চলিতে আমার হাসি পাইত। সে-সমস্ত যেন আমার গায়েই ঠেকিত না। কে আমাকে কী মনে করিবে, কিছুদিন এ-দায় আমার মনে একেবারেই ছিল না। ধুতির উপর গায়ে কেবল একটা মোটা চাদর এবং পায়ে একজোড়া চটি পরিয়া কতদিন থ্যাকারের [{১↓Thacker Spink & Co.↓]} বাড়িতে বই কিনিতে গিয়াছি। আহারের ব্যবস্থাটাও অনেক অংশে খাপছাড়া ছিল। কিছুকাল ধরিয়া আমার শয়ন ছিল বৃষ্টি বাদল শীতেও তেতালায় বাহিরের বারান্দায়; সেখানে আকাশের তারার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হইতে পারিত এবং ভোরের আলোর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিলম্ব হইত না।

এ-সমস্ত যে বৈরাগ্যের কৃচ্ছ্রসাধন তাহা একেবারেই নহে। এ যেন আমার একটা ছুটির পালা, সংসারের বেত-হাতে গুরুমহাশয়কে যখন নিতান্ত একটা ফাঁকি বলিয়া মনে হইল তখন পাঠশালার প্রত্যেক ছোটো ছোটো শাসনও এড়াইয়া মুক্তির আস্বাদনে প্রবৃত্ত হইলাম। একদিন সকালে ঘুম হইতে জাগিয়াই যদি দেখি পৃথিবীর ভারাকর্ষণটা একেবারে অর্ধেক কমিয়া গিয়াছে, তাহা হইলে কি আর সরকারি রাস্তা বাহিয়া সাবধানে চলিতে ইচ্ছা করে। নিশ্চয়ই তাহা হইলে হ্যারিসন রোডের চারতলা-পাঁচতলা বাড়িগুলা বিনা কারণেই লাফ দিয়া ডিঙাইয়া চলি এবং ময়দানে হাওয়া খাইবার সময় যদি সামনে অক্টর্লনি মনুমেণ্ট্‌টা আসিয়া পড়ে তাহা হইলে ওইটুকুখানি পাশ কাটাইতেও প্রবৃত্তি হয় না, ধাঁ করিয়া তাহাকে লঙ্ঘন করিয়া পার হইয়া যাই। আমারও সেই দশা ঘটিয়াছিল— পায়ের নিচে হইতে জীবনের টান কমিয়া যাইতেই আমি বাঁধা রাস্তা একেবারে ছাড়িয়া দিবার জো করিয়াছিলাম।

বাড়ির ছাদে একলা গভীর অন্ধকারে মৃত্যুরাজ্যের কোনো-একটা চূড়ার উপরকার একটা ধ্বজপতাকা, তাহার কালো পাথরের তোরণদ্বারের উপরে আঁক-পাড়া কোনো-একটা অক্ষর কিংবা একটা চিহ্ন দেখিবার জন্য আমি যেন সমস্ত রাত্রিটার উপর অন্ধের মতো দুই হাত বুলাইয়া ফিরিতাম। আবার, সকালবেলায় যখন আমার সেই বাহিরের পাতা বিছানার উপরে ভোরের আলো আসিয়া পড়িত তখন চোখ মেলিয়াই দেখিতাম, আমার মনের চারিদিকের আবরণ যেন স্বচ্ছ হইয়া আসিয়াছে; কুয়াশা কাটিয়া গেলে পৃথিবীর নদী গিরি অরণ্য যেমন ঝলমল করিয়া ওঠে, জীবনলোকের প্রসারিত ছবিখানি আমার চোখে তেমনি শিশিরসিক্ত নবীন ও সুন্দর করিয়া দেখা দিয়াছে।

“ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !”

কীভাবে প্রথম কথা , কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব আজ তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, মনেও নেই আমার । আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে টেক্সটাইলে প্রথমবারের মতো সেকেন্ড শিফট শুরু, প্রশাসনিক জটিলতায় প্রথমদিকে নতুনদের সাথে একটু ব্রাত্য বা হালকা দূরত্ব থাকলেও ঠিক মাস দুয়েকের মধ্যে সবাই সবার অসম্ভব কাছের হয়ে গেলাম।ছোট্ট শহীদ আজিজ হলের আবহাওয়াই বদলে গেল ; অনেকদিন পরে একবারে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রের পদচারনায়।

যদিও আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার তেমন কেউ ছিল না, ; তবে অন্য বোর্ডের কয়েকজন ছিল। সবচেয়ে বেশী মানসিক সাদৃশ্য যেটা ছিল সবার মধ্যে, সেটা হচ্ছে একধরনের মনক্ষুন্নতা—প্রকৌশলের সবচেয়ে অভিজাত প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ভর্তি ব্যর্থতার। হ্যাঁ, আমাদের সবাই হয়তো তথাকথিত সর্বোচ্চ মেধাবী ছিলাম না ; কিন্তু আমাদের মেধা ঠিক ফেলে দেওয়ার মতোও ছিল না। ঢাকা ও বাংলাদেশের জেলাশহরের নানাপ্রান্তের দূর্দান্ত ডাকসাইটে কয়েকজন ছাত্রের দেখা হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো মেধাবী ছিল সুমন। টেক্সটাইলের স্পিনিং ,ডাইং- ফিনিশিং এর চাপ এড়িয়ে ওঁর গন্তব্য যে শিক্ষকতা সেটা আমাদের মনে হয়নি কখনো।

পরীক্ষা এগিয়ে এলেই খুঁজে পেলাম আমাদের ২০তম ব্যাচের সবচেয়ে আস্থাবান বন্ধুকে আতিকুজ্জামান সুমনকে। আগের ব্যাচের সেলিম ভাইয়ের নোট বেশ পপুলার ছিল, তবে তাঁর হাতের লেখা ছিল একটু বড়ো টাইপের।সেই তুলনার সুমনের হাতের লেখা ছিল শাব্দিক অর্থেই মুক্তার মতো। সুমনের নোট ছাড়া কোন পরীক্ষা উৎরানো যাবে কল্পনাই করতে পারতাম না। PL( Preparatory Leave) শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দলবেঁধে ওঁকে তাগিদ দিতাম, দোস্ত ওই চ্যাপ্টারের নোটটা কবে শেষ করবি?

সম্ভবতঃ থার্ড ইয়ারে আমি একবার জিজ্ঞাস করলাম, সেলিম ভাইয়ের তো এই টপিক্সে একটা ভালো নোটই ছিল, তুই আবার নিজে বানাতে গেলি ক্যান। ওর উত্তর ছিল মনে রাখার মতো , পুরনো নোট আর পাঠ্যবই মিলিয়ে নিজের নোট করতে গেলে পড়া হয়ে যায়, আর নিজের লেখা নোট পড়তে বেশী ভালো লাগে,সেই সঙ্গে তোদেরও কাজে লাগে। মানুষ এতো নিঃস্বার্থ হয় কীভাবে !

ওর নোটই যে আমাদের একমাত্র পাথেয় পরীক্ষার পুলসিরাত পার হওয়ার সেটা ও ভালোভাবেই জানতো। নরমাল সাদা কাগজের ফটোকপি ভালো হয় না, তাই গুচ্ছের টাকা খরচ করে ওঁ সাদা অফসেটে পেলিক্যান কালির ইয়ুথ কলমের ঝকঝকে দূর্দান্ত লেখনীতে নোট করতো। সাদা লুঙ্গি পড়ে তকতকে টেবিলে উবু হয়ে নোট করছে সুমন, একটা চিরচেনাভঙ্গী ! বেশ ক্ষীণতনু ছিল , হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে ঈর্ষাও ছিল আবার ঠাট্টাও করতাম সবাই। জেনেটিক্যালি ও একটু হালকা স্বাস্থ্যের ছিল। শেষ দেখায়ও ওঁকে ওই ভাবেই পেয়েছি। মনে পড়ে, আমাদের ফটোকপি করতে সুবিধা হবে বলে ও মেশিনের ডায়াগ্রামগুলোও মাঝে মাঝেই কালো কালির কলমে করতো। ওঁর নোট হাতে পাওয়া মানে ছিল ওই সেমিস্টারের অর্ধেক পড়া হয়ে যাওয়া।

সারা ছাত্রজীবনে ওঁর চাপে পড়েই আমি নিজের হাতে শুধুমাত্র Viscose Fiber ও Fabric Designing চাপ্টারের নোট করেছিলাম। ওঁর অনুরোধ ছিল, মামা, তুই ওই চ্যাপ্টারে নোট করে ফ্যাল, আমি ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং গুলো করেই সময় করতে পারছি না। ওঁর ব্যস্ততার দিকে চেয়েই ওই নোট করা এবং সারা ছাত্রজীবনে ওই প্রথম এবং ওই শেষ। কিন্তু সুমনের হাতের লেখার পাশে আমার লেখা একেবারেই মানাচ্ছিল না। পরবর্তীতে আমি আর কোন নোট তৈরীও করিনি। একটু ভালোও লাগছিল, সারাবছর আমিই শুধু সুমনের নোট পড়ি, এই প্রথম ওঁ আমার নোট ফটোকপি করছে !

গত ডিসেম্বরে ছুটি রিসোর্টে সপরিবারে দেখা ! এর পরের গেট টুগেদারগুলোতে নানা কারণে ওঁর সাথে আমার দেখা হয়নি, বা হলেও ঠিক অনেকক্ষণ কথা হয়নি। রাত্রিযাপনের ওই ছুটিতে আমার স্ত্রীর সাথে ওঁর স্ত্রীর, ওঁর কন্যাদের বাচ্চাগুলোর ও আমার বাচ্চাদের মিথষ্ক্রিয়া। মিনা( আমার সহধর্মিনী) গত দুইদিন ধরে বারবার আফসোস করছে থেকে থেকে।

হল জীবনের অফুরান অসংখ্য স্মৃতি আছে। কিন্তু ওঁর মাঝে যে সদাহাস্যময় পরোপকারী মানুষটিকে আমরা দেখেছি, পেয়েছি– নিজেরা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। হুট করে জার্মানিতে পড়তে চলে গেলে সম্পর্কে একটু বিচ্ছিনতা এসেছিল , পরের বছরগুলোতে সেটা আর আমি আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আজ বেশী করে মনে পড়ছে বিশেষ একটা দিনের কথা !

চাকরি শুরু করার পরে আমরা যে যার কর্মক্ষেত্রে, ভীষণ ব্যস্ত। মোবাইলের যুগও তেমন করে শুরু হয়নি। ১৯৯৯ সালে ল্যান্ডফোনেই ওঁ জানালো, বহুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আমরা যেন অ্যাটেন্ড করি।৪০তম সমাবর্তন, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন আসবেন !আমার চরিত্রানুযায়ী যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইলেও ওঁ আমাকে বোঝাল এটা বিরাট সৌভাগ্যের সুযোগ । গ্রাজুয়েশেনের গাউন পরে সবার ছবি থাকে, আমাদেরও থাকবে। অনেকখানি ওঁর চাপে পড়েই সমাবর্তনে যাওয়া।

রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! “ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !” তাইতো, আমরা কথা কইছি, তুই নিরুত্তর। তোর অন্যলোকের যাত্রা শুভ হোক বন্ধু !

সমাবর্তনের দিনে আমার নিজের কোন ক্যামেরা ছিল না, ওঁর ক্যামেরায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললো ওঁ !অনেকবার অনেকবছর ধরে ভেবেছি ওঁর কাছ থেকে ছবির কপিগুলো চেয়ে নেব। এই ১৬ বছরে আর হল কই ! থাক্‌ তোর ক্যামেরায় তোলা ছবি আমার আর লাগবে না ! তুই নিজেইতো একটা ছবি হয়ে গেলি !

প্রকাশকালঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫