by Jahid | Dec 1, 2020 | দর্শন
বহুবছর আগে পড়েছিলাম। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটা গল্প সংকলনের নাম ছিল ‘মাপা হাসি চাপা কান্না’।
আজ বিকালে বসে ভাবছিলাম– শিক্ষিত বাঙালি মেপে হাসে কেন ? হাসলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে বুদ্ধি বের হয়ে যাবে বলে কী কম হাসে অথবা হাসতেই চায় না। লক্ষণীয় যে, লেখক ও মানুষ হিসাবে যারা কৌতুকপ্রিয়, হাসিখুশি, সমাজে তাদেরকে খুব একটা উঁচু চোখে দেখা হয় না। এই যেমন আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য , সিনেমা ও নাটকের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় অনানুষাঙ্গিক চরিত্রটি হচ্ছেন তিনি, যিনি ফিলার হিসাবে গল্পে টিকে আছে আছেন কোনরকমে। তিনি – যিনি নাটক, সিনেমার মাঝেসাঁঝে কৌতুক করছেন, লোক হাসাতে চাচ্ছেন, বিনোদিত করতে চাচ্ছেন।
পাশ্চাত্যে চার্লি চ্যাপলিন একজনই ছিলেন।
আমাদেরকে খুঁজে পেতে একজনের কথাই মনে পড়বে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রয়াত খান জয়নুল, আশীষ কুমার লোহ, আনিস, হাসমত, টেলিসামাদ, দিলদার ও নাম না জানা অনেকেই সারাজীবন পার্শ্বচরিত্রেই ছিলেন। প্রোটাগনিস্ট বা মূল অভিনেতা হতে পারেননি কখনো, কোন পরিচালক সেই সুযোগ করে দেননি।
চলচ্চিত্রে কেউ চরিত্রাভিনেতা হতে না পারলেও, নাটকে আশির দশকে আমজাদ হোসেন সেটা করতে পেরেছিলেন। সেই সময়ের ঈদের নাটকে ‘জব্বর আলী’ ছিলেন একজন সামাজিক টাউট, আদম-ব্যবসায়ী, মজুতদার। তাঁর নানা কীর্তিকাণ্ড ও ধরা খাওয়ায় দেখে দর্শক হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ত। জব্বর আলী নতুন কী কাণ্ড করে জেলে গিয়ে ঈদের সেমাই খাবে, সেটা দেখার জন্য প্রতি ঈদে আমরা বিটিভির সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম।
হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও সিনেমায় তাঁর জাদুকরী গল্প আর মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনার কাব্যই ছিল মূল চরিত্র। একজন শান্তশিষ্ট বোকাবোকা বাবা, খুব কড়া মেজাজের মা ; তরল কথা বলা দেবর, অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথাবার্তায় পটু কাজের লোক ; ভীরু প্রেমিক ও সাহসী প্রেমিকা নিয়ে তাঁর ঈদের নাটকগুলো ছিল অসম্ভব স্বাদু। কিছু নাটক নিখাদ আনন্দের, কিছু নাটকে প্রচ্ছন্ন সমাজ সচেতনতার মেসেজ।
হুমায়ূন আহমেদ জীবিতাবস্থায় তাঁর লেখালেখি দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকের মন জয় করতে পারলেও, সমালোচক ও সাহিত্য-বোদ্ধারা তাঁর পুরো লেখালেখিকেই হালকা করে দেখেছেন। কেউ কেউ জিজ্ঞেসও করেছেন, কেন তিনি সিরিয়াস লেখা লেখেন না।
আমি আসলে বোঝার চেষ্টা করছি, সিরিয়াস লেখা কয়জন পাঠকের কাছে যায়। কমলকুমার মজুমদার কি অধিক পঠিত? বিষ্ণু দের কবিতা কয়জন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে? শরৎচন্দ্র , মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, শিবরাম চক্রবর্তী, সুনীল , সঞ্জীব, সমরেশ, শীর্ষেন্দু জনপ্রিয় বলে কি তাঁরা সিরিয়াস সাহিত্যিক নন ? দুই-বাংলা তন্নতন্ন করে আমাদের একজনই সৈয়দ মুজতবা আলী আছেন ; যার অসম্ভব উইট সমৃদ্ধ প্রবন্ধ, উপন্যাস, সবধরনের লেখালেখি এক ফরমেটে ‘রম্যরচনা’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরস, চটুল, হালকা ভঙ্গীর লেখালেখিকে , কথা বলাকে এতো তাচ্ছিল্য কেন বাঙালির ! নাকি , ছোটবেলা থেকে “ যত হাসি তত কান্না, বলে গেছেন রাম সন্না” শুনে শুনে বড় হওয়া বাঙালি অবচেতনে ধরেই নিয়েছে, হাসি ব্যাপারটা মোটেও ভালো কিছু না, হাসি হচ্ছে কান্নার প্রারম্ভিকতা। আর তাছাড়া আমরা শৈশবে দেখেছি, মন খুলে হো হো হাসির হুল্লোড় উঠলেই , চারপাশ থেকে বিশেষ একশ্রেণীর আত্মীয়, মুরব্বী হা রে রে করে ছুটে আসত, ‘এতো হাসি কীসের ! কপালে দুঃখ আছে !’
হ্যাঁ, রে ভাই, হাসির পরে দুঃখ আছে বলে কি আমাদের মেপে মেপেই হাসতে হবে। দুঃখ তো হাসলেও আসবে ; না হেসে সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানা হয়ে থাকলেও আসবে। জীবনযাপনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা, প্রিয়জন হারানোর শোক, দুঃখ, বেদনা, নানাবিধ ব্যর্থতা, চাওয়া না পাওয়ার টানাপড়েন, শারীরিক অসুস্থতা, বার্ধক্য আর অবশেষে অনিবার্য মৃত্যু তো আপনার হাসির তোয়াক্কা করে না। তবু, কেন এতো চাপা কান্না, বেদনার উদযাপন, শোকের উদযাপন ! বাঙালি মনুষ্যের আকাশে সারাক্ষণ চাপাকান্নার মেঘলা আবহাওয়াই থাকবে কেন ! গম্ভীর হয়ে, সিরিয়াস হয়েও নিয়তিকে কী কেউ এড়াতে পেরেছে ! পারেনি ; পারবেও না।
বাঙালির জীবনে হাসির সূর্যালোক দূর করুক সব অপ্রাপ্তির , বেদনার কালো মেঘ।
হে বাঙালি ! হাসতে হাসতেই না হয়, নিয়তির সঙ্গে লড়াই করা শিখুন !
প্রকাশকালঃ ২৮শে অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Nov 25, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
উচ্চ মাধ্যমিকে ওঠার আগে আমি কখনো বাঙ্গালী চরিত্র বা বাঙ্গালী মুসলমানের চরিত্র নিয়ে চিন্তা করার অবসর পাইনি বা আমার মানসিক অভিজ্ঞতাও ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিকে উঠে শরৎচন্দ্রের ‘ বিলাসী’ আমাকে মুগ্ধ করল। সনাতন বাঙ্গালী-চরিত্র কেমন হতে পারে, তা তাঁর চেয়ে ভালো কেউ পরিস্ফুট করতে পারেন নি। ওই সময়েই আমাদের সম্ভবত: পাঠ্য ছিল সমাজ সংস্কারক রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের ‘ রিলিফ ওয়ার্ক’ স্যাটায়ার গল্পটি। গল্পটি “ফুড কনফারেন্স”(১৯৬৯)- বই থেকে নেওয়া। গল্পটিতে আমাদের জাতীয় জীবনের নৈতিক অধঃপতনের নিদারুণ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক । আবুল কালাম শামসুদ্দিনের মতে, লেখক এই গ্রন্থে বাঙ্গালি হিন্দু-মুসলমানের সাধারণ চরিত্রের দিক তুলে ধরেছেন । কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, সর্বকালেই ছিল । তাদের কথাও আবুল মনসুর বাদ দেননি । “রিলিফ ওয়ার্ক” এর হামিদ তেমনই একটি চরিত্র । বিপন্ন মানুষের সেবা করার জন্য ত্রাণ কর্যের দলে যোগদান করে । কিন্তু সেখানে গিয়ে হামিদ দেখতে পায় দুর্বল ভুখা-নাঙ্গারা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে, আর মাত্রাতিরিক্ত খাতির আর ত্রাণ পাচ্ছে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা । হামিদের চোখে এই অনাচার বর্ণনা করেছেন লেখক ।
কালে কালে আমি মুখোমুখি হলাম হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফার লেখার সঙ্গে। বাঙ্গালী চরিত্র চিত্রণে আহমদে ছফা ও হুমায়ুন আজাদ দুইজনই আমার কাছে প্রিয়। তবে প্রিয়তম হচ্ছেন হুমায়ুন আজাদ।
উচ্চমাধ্যমিকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে সরাসরি শিক্ষক হিসাবে ঢাকা কলেজে পাই। ক্লাসের নানা কথার ফাঁকে বাঙ্গালীর উপরে ওঠার প্রবণতার দারুণ একটা রূপকল্প তুলে ধরেছিলেন। স্মৃতি থেকে লিখছি। স্যার সম্ভবত: তাঁর কোন প্রকাশিত বইয়েও লিখেছেন । উনি কয়েকজন বাঙ্গালীকে বর্ধিষ্ণু গাছের সঙ্গে তুলনা করলেন। হাতে করে কয়েকটি কলম নিয়ে দেখালেন সবগুলোর একই উচ্চতা। এখন এর মধ্যে কোন একটি গাছকে যদি সবার চেয়ে বড় হতে হয়ে দুইভাবে সেটা সম্ভব। উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি গাছকে বেশী করে আলোবাতাস নিয়ে, পরিশ্রম করে অন্য সবার চেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। এটি কষ্টসাধ্য, সময়সাপেক্ষ।
আরেকটি সহজ উপায়ে সে নিজের মাথাকে সবার উপরে দেখাতে পারে ! তাকে নিদেনপক্ষে পাশের গাছগুলোর চেয়ে বড় দেখাবে ; হোক সেটা সমাজে , কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায়তনে বা রাজনীতিতে। সে যদি একটু চালাকি করে বাকী গাছগুলোকে ছেঁটে দেয়। নিজেকে কষ্ট করে উচ্চতায় পৌঁছুতে হল না। অন্যদেরকে ছোট করেই সে নিজেকে বড় করে ফেলল। নিন্দুক , ফাঁকিবাজ বাঙ্গালী এই দ্বিতীয় কাজটি খুব যত্নের সাথে করতে পারে। কষ্ট করে বড় না হয়ে, সারাক্ষণ তার সহকর্মীদেরকে মালিক-পক্ষের কাছে ছোট করে নিজেকে বড় দেখায় ! আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে , মালিক-পক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যাপারটা বুঝেও না বোঝার ভাণ করেন। দিনে দিনে তোষামোদির প্রাচুর্যে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিষাক্ত হতে থাকে। বড় হওয়ার সহজ উপায়টি সবাই প্র্যাকটিস করতে থাকে।
বাঙ্গালী চরিত্রের যথার্থ রূপকার হুমায়ুন আজাদ-এর কিছু বাণী চিরন্তনী সবার জ্ঞাতার্থে দিয়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে আমারও স্মৃতি ধরে রাখা হল।
বাঙ্গালী চরিত্র নিয়ে হুমায়ুন আজাদ-এর প্রিয় প্রবচনগুচ্ছ:
১। বাঙালি যখন সত্য কথা বলে তখন বুঝতে হবে পেছনে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
২।পা, বাঙলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্যে এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারো কোনও উদ্বেগ নেই।
৩। এখানে অসতেরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত।
৪। বাঙালি একশো ভাগ সৎ হবে, এমন আশা করা অন্যায়। পঞ্চাশ ভাগ সৎ হ’লেই বাঙালিকে পুরস্কার দেয়া উচিত।
৫। নিন্দুকেরা পুরোপুরি অসৎ হ’তে পারেন না, কিছুটা সততা তাঁদের পেশার জন্যে অপরিহার্য; কিন্তু প্রশংসাকারীদের পেশার জন্যে মিথ্যাচারই যথেষ্ট।
৬। যতোদিন মানুষ অসৎ থাকে, ততোদিন তার কোনও শত্রু থাকে না; কিন্তু যেই সে সৎ হয়ে উঠে, তার শত্রুর অভাব থাকে না।
৭। আমাদের সমাজ যাকে কোনও মূল্য দেয় না, প্রকাশ্যে তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করে, আর যাকে মূল্য দেয় প্রকাশ্যে তার নিন্দা করে। শিক্ষকের কোনও মূল্য নেই, তাই তার প্রশংসায় সমাজ পঞ্চমুখ; চোর, দারোগা, কালোবাজারি সমাজে অত্যন্ত মূল্যবান, তাই প্রকাশ্যে সবাই তাদের নিন্দা
করে।
৮। স্তব স্তুতি মানুষকে নষ্ট করে। একটি শিশুকে বেশি স্তুতি করুন, সে কয়েকদিনে পাক্কা শয়তান হয়ে উঠবে। একটি নেতাকে স্তুতি করুন, কয়েকদিনের মধ্যে দেশকে সে একটি একনায়ক উপহার দেবে।
৯। গণশৌচাগার দেখলেই কেনো যেনো আমার বাঙালির আত্মাটির কথা বারবার মনে পড়ে।
১০। বিনয়ীরা সুবিধাবাদী, আর সুবিধাবাদীরা বিনয়ী।
১১। কোন কালে এক কদর্য কাছিম দৌড়ে হারিয়েছিলো এক খরগোশকে, সে-গল্পে কয়েক হাজার ধ’রে মানুষ মুখর। তারপর খরগোশ কতো সহস্রবার হারিয়েছে কাছিমকে, সে-কথা কেউ বলে না।
১২। স্বার্থ সিংহকে খচ্চরে আর বিপ্লবীকে ক্লীবে পরিণত করে।
১৩। সৎ মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গ, আর সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।
১৪। মৃত সিংহের থেকে জীবিত গাধাও কতো জ্যোতির্ময় উজ্জ্বল !
১৫। আপনি যখন হেঁটে যাচ্ছেন তখন গাড়ি থেকে যদি কেউ খুব আন্তরিকভাবে মিষ্টি হেসে আপনার দিকে হাত নাড়ে, তখন তাকে বন্ধু মনে করবেন না। মনে করবেন সে তার গাড়িটার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে আপনাকে কিছুটা পীড়ন ক’রে সুখী হ’তে চায়।
১৬। টাকাই অধিকাংশ মানুষের একমাত্র ইন্দ্রিয়।
১৭। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপজ্জনক।
প্রকাশকালঃ২৬শে অক্টোবর,২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য