কর্পোরেট অবজার্ভেশন (বাংলাদেশের নবীন উদ্যোক্তাদের বর্তমান অবস্থা )

আমাদের কিংবদন্তী অর্থনীতিবিদদের কাছে ‘চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হও!’ ‘ সামাজিক ব্যবসা’ ইত্যাদি শুনে শুনে আমার মতো কুলি মজুরদেরও মাঝে সাঁঝে জানতে ইচ্ছে করে, এতো বড় একটা প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কি করছে ! তাঁদের মৌলিক বাধা কি কি ; নবীন উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? আমাদের নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা কি ?

সম্ভবত: ২০০৭/৮ এর পর থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অধুনা কয়েকবছর যাবত তা দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই গ্যাসের লাইন নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের কি পরিমাণ ‘ স্পিড মানি’ খরচ হচ্ছে ; সেটা শুনলে অনেকের চোখ কপালে উঠবে ! বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, আমাদের জ্বালানী সংকট, রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি আমাদের বস্ত্রশিল্পকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে অন্যতম রপ্তানীমুখি শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা আসার পরিমাণ গেছে কমে । নতুন টেক্সটাইলে নতুন উদ্যোক্তাদের পদচারণ নেই বললেই চলে । যা হচ্ছে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ! কারো ৬ লাখ গজ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, সে এক ধাক্কায় ১২ লাখ গজ করে ফেলছে। কারো ৩০ লাইনের কারখানা ছিল, সে কয়েকবছরে ৬০ লাইন করে ফেলছে। অসম মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসংখ্য ছোট মাপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝারি মাপের গার্মেন্টসগুলোর মালিকানা বড় গ্রুপগুলোর কাছে চলে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর আরও বৃহদায়তন হচ্ছে।

দেড় যুগ আগে আমার কর্মজীবনের শুরুতে দেখেছি , গার্মেন্টস-এর মালিকদের প্রধান উৎপাদন নির্ভরতা ছিল , কাপড় উৎপাদন করা ও সেলাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ বা অন্যান্য খুচরা পণ্যের সরবরাহ ছিল পুরোটাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে। বোতাম, টুইল টেপ, লেবেল, সুতা, কার্টন, পলি ব্যাগ, স্ক্রিন প্রিন্ট , এমব্রয়ডারি যাবতীয় সরবরাহ ছিল ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনেক লোকের কর্মসংস্থান হত।এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানায় সব ধরণের সার্ভিস ও ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ ইউনিট খুলে বসে আছেন।
তাহলে ঐ ক্ষুদ্র- মাঝারি উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, পুরনোরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন । এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের নৌকার পাল না তুলে ‘ আরামদায়ক’ চাকরির বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টর ছেড়ে অন্যদিকে আসি। স্কয়ার বা প্রাণ-আরএফএল এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণের স্বার্থে উদাহরণ হিসাবে ধরছি। স্কয়ার-এর ফার্মাসিউটিক্যালস দিয়ে ব্যবসা শুরু। পরে টেক্সটাইল, তারপরে ফুড ও বেভারেজ, কসমেটিক্স, টয়লেট্রিজ, হাসপাতাল সব। দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠতায় তাঁদের সকল পণ্য একটা ব্র্যান্ড লেবেল পেয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্যতা এমন পর্যায়ে গেছে, তাঁদের পণ্য চোখ বুজে ভোক্তারা কিনে থাকে। কিন্তু এমন অনেক পণ্য ছিল, যেগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে বেঁচে থাকত। সেগুলোও ধীরে ধীরে স্কয়ার দখল করে নিয়েছে। সামান্য ঝাল মুড়ি বা চীনাবাদামও যদি স্কয়ারের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে, তাহলে সাধারণ ভোক্তাদের কেউ কি আর চলতি ঝাল মুড়িওয়ালার কাছ থেকে কিনবে ?

ঐদিকে প্রাণ-আরএফএল এর মূল পণ্য সম্ভবত: ছিল, একদিকে তরল পানীয় অন্যদিকে হেভি-লাইট মেশিনারিজ, নলকূপ ইত্যাদি। এখন তাঁরা সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে শুরু করে সামান্য বালতি,বদনা পর্যন্ত উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। হাস্যকর হলেও সত্য, প্লাস্টিকের বদনা খুবই ছোট মাপের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে থাকতেন। যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্লাস্টিকের বদনা, বালতি তৈরি করত তাঁর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া এখন গত্যন্তর নেই । ব্র্যান্ড ইমেজে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক পিছিয়ে আছে। পেপার ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা বিজ্ঞাপনে সবকিছুই ব্র্যান্ডিং ও বিক্রি করা সম্ভব।

বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রচলিত পণ্য ছাড়াও ছোটখাটো সবরকম পণ্যের বাজার যেভাবে দখল করা শুরু করেছে; দেখে শুনে মনে হচ্ছে , সেই দিন আর বেশি দুরে নেই, কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাংলাদেশের তাবৎ পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকবেন। পুঁজি বাজার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা পকেটে পুরে ফেলেছেন আমাদের বড় উদ্যোক্তারা।

আবার ফিরে আসি আমাদের টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতে। কেন নতুন উদ্যোক্তাদের দেখা নেই ?কেন এঁরা নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহী হচ্ছেন না ?

প্রথমত: বড় উদ্যোক্তারা ছোটদের ডি-মার্কেটিং করছেন। বড় মাছ, পুকুরের সব ছোটমাছকে খেয়ে ফেলছে।

দ্বিতীয়ত: ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাদের আগের মতো সহায়তা করছে না। ব্যাংক নিরাপদ বিনিয়োগে বড় ঋণ-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে আবার নতুন করে ঋণ দিচ্ছে। আর আমাদের অসংখ্য মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না , তাঁদের চাকরি বাজার ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আদৌ সম্ভব কীনা, হলেও সেটা কীভাবে ! তৃতীয়ত: (এটি আমার ব্যক্তিগত মতও বটে)—ব্রিটিশ কেরানি-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদের অগুনতি কেরানী তৈরি করছে। শত শত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আমাদের বেশি দরকার – হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষা নির্ভর শিক্ষালয়। যেখানে, একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ,আমাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী করে ফেলছে। একটা চেয়ার ও টেবিলের বসার সুযোগের জন্য আমাদের সকল সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত ।

বাংলাদেশ সরকারের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু মাস্টার প্ল্যান হয়তো আছে। আমি জানি না । নানা ধরনের ফান্ড থাকে , এসএমই ( Small Medium Entrepreneur) ঋণ থাকে। সেটা কতখানি সঠিক জায়গায় পৌঁছায় , সে ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ অমূলক নয়। এবং প্রতিবছরে ওই ফান্ডের যথোপযুক্ত ব্যবহার হয় কিনা , সেটার কোন তথ্য কারো জানা নেই।

কিছুদিন আগে , বিশাল শিল্পকারখানার মালিক এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজেও চাইতেন, ছোট ছোট স্ক্রিন প্রিন্টিং কারখানা , লেবেল, পলি , টুইল টেপ, বাটন , কার্টন ফ্যাক্টরি ফ্যাক্টরি চালু থাক। কিছু লোকজন উদ্যোক্তা হোক। মুশকিল হচ্ছে, তাঁর অভিজ্ঞতা এই ব্যাপারে খুবই তিক্ত ! তিনি হয়তো ভালো মানের সুতা দিয়েছেন তাঁর টুইল টেপ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু , ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অতি লোভে , মাঝপথেই গাড়ীসহ সেই ভালো মানের সুতা বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে, দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট খোলা বাজারের সুতা কিনে তাঁর টুইল টেপ বানিয়ে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় গুণগত মানে তাঁর গার্মেন্টস ফেল করেছে।

একই কথা অন্যসব বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য, এঁরা যে দামে কাজ ছোটদেরকে দেয়। তাঁরা যদি সঠিক উপাদান ব্যবহার করত তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু, কিছু অতিলোভী দ্রুত মুনাফা কামী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কৃতকর্মের দায় নিতে হচ্ছে অন্য সবাইকে। প্রায়শই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বড় প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলে দেয়। অনেকবার দেখেছি, সামান্য সুতা, বোতাম, কার্টন, টুইল টেপ, স্ক্রিন প্রিন্ট ফ্যাক্টরির গুণগত মানের সমস্যা অথবা সরবরাহে দেরী হওয়ার গার্মেন্টস মালিককে ডিসকাউন্ট ও এয়ার শিপমেন্টের জরিমানা গুনতে হয়েছে।

দ্রুত বড়লোক হওয়ার ও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পড়ে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় প্রতিষ্ঠানের ভরসা হারিয়েছেন। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানার অভ্যন্তরেই সব ছোট ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজ করে ফেলেছেন। কেননা, তাঁরা তাঁদের মিলিয়ন ডলারের শিপমেন্ট সামান্য কয়েক পয়সার অ্যাকসেসরিজের জন্য হুমকির মুখে ফেলতে চান না।

এই দুষ্টচক্র থেকে কীভাবে বের হওয়া সম্ভব , সেটা নিয়ে কী ধরণের গবেষণা হওয়া উচিৎ সেটা জানার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে আলোচনা।

প্রকাশকালঃ ১০ই মার্চ, ২০১৭

ব্যবহারিক ধর্ম ও বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা

দৃশ্যপট ১:

আশির দশকে ঢাকা থেকে পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোতে যাওয়ার সহজলভ্য রুট ছিল ঢাকা-আরিচা-গোয়ালন্দ হয়ে যাওয়া। আব্বা-আম্মার সাথে নানাবাড়ি যাচ্ছি–শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতির একটা। লঞ্চের ভেঁপু, ঘাটের হোটেলে আব্বার সাথে বড়মাছের পেটি দিয়ে ভাত খাওয়া। হোটেলের সামনে বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের থালায় রাখা টকটকে রঙের তরকারি। ঘাটের হোটেলের মেসিয়ারগুলোও কী যত্ন করে আমাদের বসতে দিত, প্লেট এগিয়ে দিত; শিশু হিসাবে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হত।
খাওয়া শেষে গোয়ালন্দ স্টেশনে কুষ্টিয়া-গামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। ট্রেন শুরু হলেই সেই আঞ্চলিক টানের হাতি-ঘোড়া মারা চিৎকার চেঁচামেচি। এখন চীনাবাদাম তো একটু পরেই ঝালমুড়ি, তারপরে সিদ্ধ ডিম। ‘এই চানাচ্চুর’ শুনে আবার খাওয়ায়। রাজ্যের হিজিবিজি খাওয়ার অবাধ স্বাধীনতা ঐ সময়টিতে।

দৃশ্যপট ২:

নদীর গতিপথের পরিবর্তনে ফেরিঘাট আরিচা থেকে সরতে সরতে পাটুরিয়াতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন হয়নি শুধু দরিদ্র চেহারার ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর ছেলেদের মসজিদ বা মাদ্রাসার জন্য চাঁদা তোলাটা। ঘাটের মোড়ের জ্যামে গাড়ী থামলেই , চাঁদার রশিদ বই হাতে এক বা অধিক দরিদ্র চেহারার মুসল্লি সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।
সম্ভবত: আরিচা ঘাটের একটা নির্দিষ্ট মোড়ে আমি বছর বিশেক ধরে ছোট একটা মাইক দিয়ে মসজিদের চাঁদা তুলতে দেখেছি। আদৌ মসজিদ হয়েছে কীনা জানিনা। হয়তো বাঁশের ছাপড়ার একটা মসজিদ হয়েছে , হয়তো হয়নি ; কিন্তু আমি জানি, চাঁদার বড় অংশটাই ব্যয়িত হয়েছে পার্থিব ক্ষুন্নিবৃত্তির কাজে।

দৃশ্যপট ৩:

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরের একপ্রান্তে , মিরপুরে । কালেভদ্রে গ্রামে নানার বাড়ী। ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর বা বড় দাঁড়ির যুবকদের প্রাদুর্ভাব গ্রামেই বেশী ছিল। নতুন যে হুজুরটি সম্মানের সাথে বৈঠকখানায় আপ্যায়িত হচ্ছেন , সে হয়তো বছর দশেক আগেও আমার ছোটমামার স্কুলের সতীর্থ ছিল। এখন সে সবার আখিরাতের হেফাজতের পরামর্শ দিয়ে থাকে। ঐ দিকে ঢাকায় আমাদের বাসার পাশেই ছিল মসজিদ ও লাগোয়া কওমি মাদ্রাসা। বেশ অনেকবছর ধরে মহল্লার বাসাগুলো থেকে রোস্টার পদ্ধতিতে সপ্তাহের একদিন করে করে মসজিদের ইমামকে খাবার দাবার পৌঁছে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। নিজেরা যাই খাই না কেন, ইমাম-সাহেবের জন্য ঠিকই আম্মা আঁচলের বাঁচিয়ে রাখা টাকা বের করে মুরগীর ঝোল করে খাওয়াতেন। ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’ আর ‘ধর্মভীরু মুসলমান’। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে বড় ধরণের তফাৎ আছে। আমাদের বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন ‘ধর্মভীরু মুসলমান’ !

পবিত্র আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য আমাকেও মহল্লার মাদ্রাসায় যেতে হয়েছে ! কিন্তু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আলিফ জবর আ, বে জবর বা করে করে আমপারা পর্যন্ত আসতে আসতেই বোর্ডের বৃত্তি পরীক্ষা চলে আসল। আমার পবিত্র ভাষা শিক্ষার ওইখানেই সমাপ্তি। পাশাপাশি বসে আরবী পড়ার সময় আমার মাথায় যখন টম অ্যান্ড জেরী, থান্ডার ক্যাটস ঘুরতো ; আমার পাশে বসা নিম্নবিত্ত অপুষ্ট ছেলেটার মাথায় হয়তো তখন ঘুরতো দুপুরের খাবারের চিন্তা ,মাদ্রাসার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরমমসলা তরকারির গন্ধ। একটা অনতিক্রম্য সামাজিক-আর্থিক-মানসিক দূরত্বে বেড়ে ওঠা আমাদের।

উচ্চ-মধ্যবিত্ত কাছের এক বন্ধুর দুইভাই-দুইবোনের সবচেয়ে ছোটভাইটিকে মাদ্রাসায় দেয়া হয়েছিল। যথারীতি ব্যবসায়ী বাপ-দাদার আখিরাতের সুরাহা করার আশায়। ঘরোয়া নানা উৎসবে ছোটভাইটি আমাদের সঙ্গে সব ব্যাপারে তাল মিলিয়ে চললেও ওর সেই সাদা জোব্বা আর দাঁড়ি নিয়ে কোথায় যেন একটা দূরত্ব থাকত ! দিনে দিনে সেটা বেড়েই গেছে আর কমেনি !

মূল প্রসঙ্গে আসি।

মাদ্রাসার ব্যাপারে আমার কোন বিদ্বেষ ছিলনা বা নেই। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ‘লালসালু’ র সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরে কেন জানি মনে হয়েছে বাংলাদেশে ধর্মের আধ্যাত্মিকতা বা স্পিরিচুয়ালিটির চেয়ে এর ভিক্ষাবৃত্তির ব্যবসাটা অনেক বেশী শক্তিশালী । গরীব ঘরের ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পেলে অন্তত তাঁর নিজের খাওয়া পড়ার চিন্তা থাকে না। এমনকি মধ্যবিত্তের যে ছেলেটি স্কুলের পড়াশোনায় একটু দুর্বল তাকেও আর আখিরাতের লোভে মাদ্রাসায় দিয়ে দেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল।
আমার কাছে মনে হয়েছে এই ফিনফিনে দাঁড়ির হুজুরদেরকে সামাজিকভাবে খাইয়ে দাইয়ে আমরা একটা ভিক্ষুকশ্রেণিই তৈরি করে চলেছি। কোনরকম কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শুধু ধর্মীয় অনুশাসন- আচারের চর্চা বজায় রাখার জন্য , সমাজের এতো বড় একটা কর্মক্ষম অংশকে আমরা অকর্মণ্য পঙ্গু করে চলেছি। এই ভিক্ষাবৃত্তি আমার ভালো লাগেনি কখনোই।

এই মধ্য যৌবনে এসে জঙ্গিবাদের উত্থান বা হেফাজতের উত্থানে আমি মর্মাহত হয়েছি। আমার ভিতরে কিছুটা বিতৃষ্ণা এসেছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই । বহুবছর ধরে আমাদের বাড়ির কোরবানির চামড়ার টাকা মহল্লার মাদ্রাসায় দেওয়া হত।গত বছর পাঁচেক আগে থেকে আব্বা-আম্মা বেঁচে থাকতেই তাঁদের অনুমতিক্রমে সেটা এখন দেওয়া হয় দরিদ্র আত্মীয়দের।

আমার সহকর্মীর সাথে বহুদিন আগে কথা হচ্ছিল আমাদের এই অনুৎপাদনশীল কওমি মাদ্রাসা-শিক্ষিতদের জনগোষ্ঠী নিয়ে। সহকর্মী তাঁর শিক্ষক পিতার প্রসঙ্গে কথা উঠলে চমৎকার কিছু কথা বলেছিলেন, মনে গেঁথে আছে। সহকর্মীর বাবা দীর্ঘদিনের মফঃস্বলের শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা-শিক্ষিত মৌলভিদের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলার দারুণ একটা সমাধান বলেছেন। আমার ভালো লেগেছে। আমি জানি তাঁর এই মতের সাথে অনেকে দ্বিমত পোষণ করবেন। কিন্তু এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বহুভাবে বলেও কওমি মাদ্রাসায় আধুনিক শিক্ষার কারিকুলাম কোন সরকার এস্টাব্লিশ করতে পারেন নাই। চারিদিকে যে ধর্মীয় আবহাওয়া বেড়ে উঠছে ভবিষ্যতেও সেটার কোন সম্ভাবনা দেখছিনা।

সহকর্মীর শিক্ষক বাবা একটু রিভার্স চিন্তা করেছেন ।
আসলে এই মাদ্রাসার হুজুর ও ইমামদের উপরে আমাদের সামাজিক ধর্মীয়-জীবন কতখানি নির্ভরশীল, কোথায় কোথায় তাঁদের ছাড়া চলেই না সেটা তিনি আগে চিহ্নিত করেছেন।

মৃতব্যক্তির দাফন ও জানাজা।

আপনি কম বা বেশী ধার্মিক যাই হোন না কেন , মৃত্যু আপনাকে বাধ্য করবে ধর্মের হেফাজতকারীদেরকে ডেকে আনতে। কারণ আপনি মুসলমান হলেও আপনার কোন ব্যবহারিক জ্ঞান নেই দাফন-কাফনের। সুতরাং মৃত্যুর এই বিষাদময় উৎসবে এঁদের বিকল্প নেই। পুরো প্রক্রিয়াটিতে, গোসল করানো, কাফন পড়ানো, কবরে নামানো, কুলখানির দিনের দাওয়াত। পরবর্তীতে কোরআন খতম, ফকির-মিসকিন আত্মীয়দের খাওয়ানো, দোয়া করা প্রতিটা ক্ষেত্রেই এঁদের সরব উপস্থিতি, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। আপনাকে নত হতে হয়, আপনার চিরপ্রস্থানকারী পিতা মাতার আখিরাতের সুরাহা করতে হয়।

কিন্তু আপনি যদি এই প্রক্রিয়াটি নামাজ শিক্ষার মতো স্কুলেই শিখে ফেলতেন?

আপনার জন্য ব্যাপারটা অনেক সহজ হত না ? আপনি তাসবীহ রুকু পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারছেন আর এইটা শিখতে সমস্যা কি? এটা তো আমাদের মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটা সমাপ্তি।

আর আছে, কোরবানি দেওয়া, নামাজের ইমামতি করা , মিলাদ পড়ানো, মৃতব্যক্তির আত্মার শান্তিতে মোনাজাত করা ইত্যাদি।
এখন , বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক ইসলাম ধর্ম শিক্ষা আছে দশম শ্রেণী পর্যন্ত।
সেখানে, ১০০ নাম্বারের পুরোটাই লিখিত না রেখে। ৫০ নম্বর ব্যবহারিক রাখা হোক।
কীভাবে মৃতব্যক্তিকে গোসল করাতে হবে, কীভাবে জানাজার নামাজ পড়াতে হবে, কোরবানি কীভাবে করতে হবে, নামাজের ইমামতি কীভাবে করতে হবে সবকিছুর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকুক।

সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন এই ধর্মের ব্যবহারিক অনুশাসন ও আচারগুলো ভালোমতো প্র্যাকটিস করবে, তখন এই অনুৎপাদনশীল মাদ্রাসা শিক্ষিতদের উপরে নির্ভরতা কমে যাবে। ভিক্ষাবৃত্তি ত্যাগ করে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হোক এই জাতি।
কেননা আমাদের যেতে হবে অনেকটা পথ !

[ প্রকাশকালঃ ৩১শে আগস্ট,২০১৬ ]