by Jahid | Jan 18, 2023 | ছিন্নপত্র, দর্শন, লাইফ স্টাইল
ফেসবুককে আমার প্রথম থেকেই মনে হতো একটা ঘরোয়া আড্ডার মতো। একটা লিটল ম্যাগাজিন পড়ার অনুভূতি থাকত। লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে যেমন সারাক্ষণ তরতাজা মচমচে স্বাদু অনুভূতির ছাপানো হরফ থাকে , সেইরকম । এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। অসাধারণ কিছু মেধাবী লেখকের দৈনন্দিন দিনলিপি পড়ার সুযোগ ঘটেছে। আমি আরো বেশি রাজনীতি ও সমাজ সচেতন হয়েছি। নবীন প্রজন্মের কিছু চিন্তক , দার্শনিক , কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা প্রতিদিন পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে। এঁদের একজন সতীর্থ আহসান। গতকাল , কিছু কথোপকথনের পরে, তিনি আমার লেখালেখি সম্বন্ধে কিছু বললেন। আমার কাছে ,সেটা অসংখ্য লাইক , লাভ, ওয়াও ইমোজি চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অনুমতি নিয়েই নিজের ওয়ালে পোস্ট করলাম।
“ আপনার লেখাজোকা ফেসবুকে যা প্রকাশিত হতো, মাঝেমধ্যে পড়া হত। হয়তো রিএকশন দিতাম, কখনো কখনো দিতাম না। আপনি মূলত প্রবন্ধ ঘরানার লেখা লিখে থাকেন। মোটামুটি লম্বা লম্বা বাক্যে। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না। যেন শ্বাসরুদ্ধকর কোনো ফিকশন পড়ছি, এমন একটা অনুভূতি জাগে। সেই টানা টানা শ্বাসরুদ্ধকর বাক্যগুলোর মাধ্যমে যে চিন্তার প্রকাশ ঘটান সেটা সব সময়ই কোনো না কোনো ভাবে চিন্তা উদ্রেককারী হয়ে থাকে।
পরিচ্ছন্ন ভাষা আর গোছানো চিন্তা আপনার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বোঝা যায় আপনি দুনিয়াকে অবহেলিত শোষিত পীড়িত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। গণমানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়– এমন কোনো আচরণ আপনাকে ক্রুদ্ধ আর ব্যথিত করে। সেই মনোভাবকেই আপনি শৈল্পিক ভাষায় উপমায় প্রকাশ করেন। আমি শুধু অনুরোধ করব, এই ক্রোধ/দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি আরেকটা স্টেপ যোগ করুন। যেটা হচ্ছে, সেই বিপর্যয়টা কীভাবে কাটিয়ে উঠা যায় সেটার পরামর্শ দিতে পারেন। দেশি বিদেশি নানা উদাহরণ সহযোগে। এতে আমার মনে হয়, আপনার লেখাটার গুরুত্ব আরো বাড়বে। আপনি নিজে কী, নিজে ঠিক বুঝতে পারছেন না, এর কারণ আত্মবিশ্বাসহীনতা। এইটা একটা মারাত্মক ব্যাধি জাহিদ ভাই। এই রোগে যারে ধরে সে সাধারণত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
এবার আরেকটা কথা শুনেন। আপনি থাকেন ২ নাম্বার রোডে। আর আমি থাকতাম ৩ নাম্বার রোডে। আপনার ঠিক বিপরীত রোডেই। আপনি বেশ কয়েকবার আড্ডার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি প্রায়ই আপনার বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে আসতাম। কিন্তু আপনাকে জানিয়ে যাওয়া হতো না। কারণ, সেই তীব্র হীনমন্যতা। আমি ওখানে থাকতাম, একাই লাগত। আপনার সাথে প্রায়ই আড্ডা দিতে ইচ্ছা হতো। সাহিত্য আড্ডা আর কি। কিন্তু তখনই আমার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যেত। এই জন্য দুঃখিত। সামনে কখনো গেলে, এই নেকাব আর রাখব না। এই যে আমার আত্মবিশ্বাসহীনতা, এইটা অনেকগুলো সম্ভাবনাকে খুন করে থাকবে। হয়ত মনের সব বাঁধা পেরিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে পারলে আমাদের চমৎকার সব সাহিত্য-আড্ডার অভিজ্ঞতা ঘটতে পারত। আপনার পরামর্শ বা কথাবার্তা আমার লেখাকে সমৃদ্ধ করতে পারত। আমার কোনো পরামর্শ হয়ত আপনারও কাজে লাগত। কিন্তু আমার এই আত্মবিশ্বাসহীনতা সে সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিলো।
আপনার লেখার হাত যথেষ্ট ভাল। চিন্তা পরিষ্কার। বইয়ে স্থান দেবার মত লেখা। শুধু একটু মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাস বিনিয়োগের অভাব। মনে যা আসে, লিখতে থাকুন, তা যতই খারাপই হোক, এতে লেখার ফ্লো টা ঠিক থাকে। এই ফ্লো খুব ইম্পরট্যান্ট জিনিস। আর সময় পেলেই নানা বই পড়বেন। লেখার ফ্লো তৈরিতে বই পাঠের ভূমিকা অনেক। চিন্তাও সমৃদ্ধ হয়।
লেখা থেকে ধর্ম আর রাজনৈতিক বিষয়টা যেন সরাসরি না আসে তা খেয়াল রাখবেন। জানেনই তো এইদেশে মুক্তভাবে কথা বলার পরিবেশ নাই। একটা পদ্ধতি আছে, সেটার মাধ্যমে আপনি ধর্ম ও রাজনীতিকেও সমালোচনা করতে পারবেন। সেটা আপোষ পদ্ধতি বা ছলনা পদ্ধতি। এমনভাবে লিখতে হবে যাতে মনে হয় আপনি তাদের বিপক্ষের কেউ না। তাদেরই একজন। বন্ধ বান্ধব যেমন নিজেদের বন্ধু বান্ধবদের সমালোচনা করে। এই রকম আর কি। তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে এই দুইটা বিষয় এড়িয়ে চলাই অধিকতর ভালো। লেখার মত দুনিয়ায় কত বিষয় আছে ভাই। তবুও এই দুইটাই যদি আপনাকে বেশি পীড়িত করে, তাহলে অবশ্যই ডিরেক্ট ম্যাথডে লিখবেন না। নানা ছলনার আশ্রয় নিবেন। এতে মূল কাজটাও হয়ে গেল, আপনিও টার্গেট হলেন না।
যা করুন, আর নিজেকে অবহেলা করবেন না। আপনাকে ক্লাসিক লেখক হতে হবে এই দিব্বি কে দিছে। আপনি একজন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিশেবে আপনার মতামত প্রকাশ করবেন দুই মলাটের মধ্যে। এবং, সেটা খুব ভাল ভাবে সম্পন্ন করার যথেষ্ট যোগ্যতা আপনার রয়েছে। জাস্ট শুরু করে দিন।”
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
বন্ধু-তালিকা পূর্ণ হয়নি, কিছু আছে বাকী।
কিন্তু মাঝে মাঝে আমাকেও যে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হয়। যাঁদের লেখা আমাকে থমকে দেয়, চিন্তা করতে বাধ্য করে, মনে হয়, আরে ! এই লোকের সঙ্গে আমার আগে কেন যোগাযোগ হয়নি ! তাঁদেরকে বিনীতভাবে বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠাই, কেউ অ্যাকসেপ্ট করে , কেউ করে না তাঁদের বন্ধু-তালিকা জুকারবার্গের কোটা হিসাবে পূর্ণ হয়ে গেছে বলে। আমি তাঁদেরকে ফলো করি। কিছুদিন তাঁদের স্ট্যাটাস ‘সি ফার্স্ট’ করে রাখি। বিস্মিত হই, কীভাবে লেখেন এঁরা ! আমার বন্ধু-তালিকায় কিছু রিকোয়েস্ট পেন্ডিং আছে, তাঁদেরকে অ্যাড করতে পারছি না , মূলত: আমার নিজের সক্ষমতাই হারিয়ে যাবে বলে। দয়া করে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মুশকিল হচ্ছে, এখন যদি নতুন করে কাউকে অ্যাড করতে হয় , তবে – পুরনো কাউকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিছুদিন আগে কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছিলাম। দেখা গেল, একই ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে তিন চারটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, প্রতিবার রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন আর আমি অ্যাকসেপ্ট করেছি। একই লোকের কয়েকটা অ্যাকাউন্টের যুক্তিসঙ্গত কারণ কী কী থাকতে পারে আমি জানি না। তবে, আমার ধারণা, এঁরা হয়তো পাসওয়ার্ড ভুলে গিয়েছিলেন অথবা নানাবিধ কারণে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়েছে ; কিন্তু বহুবছর ধরে পুরনো অ্যাকাউন্টগুলো আর ব্যবহার করেন না। এরকম গোটা বিশেক কমিয়েছিলাম মাত্র। কাকে রেখে কাকে সরাবো , সেটা একটা কনফিউশনের ব্যাপার হয়ে গেল। সেই চেষ্টা বাদ দিলাম।
আমার বন্ধু-তালিকায় কেউ কেউ ফেসবুকে আছেন, কদাচিৎ ব্যবহার করেন না, হয়তো করবেন ও না ; কিন্তু সবার আছে বলে তাঁর নিজেরও একটা অ্যাকাউন্ট কেউ খুলে দিয়েছে। এঁদের কাছে ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে বাস্তবের জগতে অনেক বেশী মূল্যবান।। সে রকম কাউকে মুছে ফেললে আশা করি তাঁরা মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার সুযোগ পাবেন না। কারণ তাঁরা সারাবছরে হ্যাপি নিউ ইয়ার, ঈদ মুবারক অথবা নিজের জন্মদিনের দিন ছাড়া ফেসবুকেই তো ঢোকেন না !
হয়েছে কী ! ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের ফেসবুকে আসা। অন্য সবার মতো আমিও ‘মুরাদ টাকলা’ বাংলিশ ভাষায় ফেসবুকিং করতাম। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল কয়েকটা বছর , মাসে একটা ‘ Dosto Kemon Achis’ টাইপ স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুক চালানো। মাঝে সাঝে পিকনিক ও গেট টুগেদারের ছবিটবি দিতাম। সেভাবে বাংলায় টাইপ করতে পারতাম না, বাংলিশ লিখে অন্যদের বিরক্তও করতাম না।
নিজেকে প্রকাশ করার আনন্দ আর সেই আনন্দে লেখালেখির ফ্লো আসল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে — গণজাগরণ মঞ্চের শুরু থেকে। আমার এক বন্ধু সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মিঞা মোহম্মদ হুসাইনুজ্জামান শামীম( Miah M. Hussainuzzaman) যে একাধারে ব্লগার এবং সচলায়তনে লেখালেখি করত–সে আমাকে অভ্র শিখে বাংলা লেখায় উৎসাহিত করল। বাংলায় লেখালেখি শুরু হল। নানা অভিজ্ঞতা, যেগুলো আসলে দিনলিপির মতো ; সেগুলো ফেসবুকে দেওয়া শুরু করলাম। শামীমের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশী ব্লগার বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হল। বাংলা ব্লগ যে এতো এগিয়েছে, লেখার মান যে এতোটা বেড়েছে — সেটা ‘সচলায়তন’ না পড়লে বুঝতাম না। দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা এই ব্লগিং এ জড়িত। ২০১৩ সাল আমার চোখের সামনে দিনরাত নানা মাপের বাংলা রম্যরচনা, কবিতা, প্রবন্ধ ঘুরতে লাগল। চরম উদাস নামের এক ছদ্মনামের ব্লগারের লেখারতো রীতিমত ভক্ত হয়ে গেলাম। সৈয়দ মুজতবা আলীর পরে এই লেভেলের স্যাটায়ার আরও কেউ লিখেছে কীনা জানি না। তবে, এই ভদ্রলোককে আমি আমার গুরুর কাতারে রাখলাম।
ফেসবুককে আমার তখন মনে হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনের মতো মুচমুচে স্বাদের। এখনো, তাই মনে হয় ; ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিপস চানাচুর খাওয়ার মতো। খেতে ভালোই লাগে, কিন্তু এতে না ভরে পেট, না আছে পুষ্টিগুণ।
২০১৩ সালের দিকে বন্ধু সংখ্যা বাড়ানো কিছুটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার ছিল ! ওর ২০০ বন্ধু আর আমার মাত্র ১০০ ! আচ্ছা, দেখি কী করে বাড়ানো যায়। তো, সেভাবে চেনা অচেনা, কোন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড নাই, তাদেরকেও নিজের বসার ঘরে দাওয়াত দিলাম। কিছুদিন পরে লক্ষ্য করলাম হুজুগে সংখ্যাই শুধু বেড়েছে, অথচ অনেকের সঙ্গে মন মানসিকতা ও চিন্তা চেতনার বিন্দুমাত্র মিল নেই আমার ! আবার এমন অনেকে আছেন, যাঁদের সঙ্গে কোনকিছুতেই আমার মতের মিল হয় না , হবে না , হওয়ার সম্ভাবনা কম; কিন্তু তাঁদের বিপ্রতীপ চিন্তা, মাইক্রোস্কোপের উল্টো পাশ থেকে দেখার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে ।
ফেসবুক আমার জন্য শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মোবাইল স্ক্রিনের চকচকে বিপ্লবী অথবা মোটিভেশনাল কথা বলা ভার্চুয়াল লোকটি আর সামনে জড়সড় হয়ে বসা লোকটির মাঝে হাজার মাইলের তফাৎ ! সেটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে।
ফেসবুকের বাইরে আমার অনেক বন্ধু আছে, যারা হয়তো আমার ফেসবুকে আছেন অথবা নাই ; আমার পোস্ট পড়েন অথবা পড়েন না ; লাইক কমেন্টস কখনো করেন না বা করবার মতো সময়ই নেই তাঁদের। তাঁদের সঙ্গে আমার প্রতিনিয়ত কথা হয়, হাসাহাসি হয়। লাইক, লাভ,ওয়াও , স্যাড, অ্যাংগ্রি ইমোর বাইরে আমাদের জান্তব সম্পর্ক। এই সম্পর্ক ‘কী বোর্ডের’ এক ক্লিকে হয় নি। এক ক্লিকে যাবেও না। এই সব বন্ধুত্ব আমার কাছে অনেক মূল্যবান। এই সম্পর্কগুলো আমার গত ৩০ বছর ধরে গড়ে তুলতে হয়েছে। ফেসবুকের ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আর লাইক কমেন্টস গুণে গুণে আমার জীবন কাটে না। কারো কাটা উচিৎও না। তাই, বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে রেসপন্স না পেলে ভাববেন না, আমি ‘ভাব’ দেখাচ্ছি। আমার ফেসবুক ও কমেন্টস পাবলিক করা আছে। ফ্রেন্ড লোগোর উপর টিক চিহ্ন না থাকলেও আমার যে কোন মন্তব্যে আপনি একমত ও দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
আগামী নতুন বছর, নতুন আশার আলো ভাসিয়ে দিক না চাইতে পাওয়া আমাদের এই একটি মাত্র জীবনকে। আমার মতো অধমের যে কোন ভুল ত্রুটি ক্ষমা করার মতো মহানুভব হয়ে উঠুন সবাই। শরীরের যত্ন নিন, পরিবারকে সময় দিন। সবার জন্য শুভকামনা। সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা।
প্রকাশকালঃ ৩১শে ডিসেম্বর,২০১৯
সাম্প্রতিক মন্তব্য