নবীন প্রজন্মের জন্য কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন।দ্বিতীয় পর্ব।।

৬। প্রযুক্তি ও দক্ষতা, এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় :
বাংলাদেশের যে দক্ষ জনশক্তি আছে ও ক্যাপাসিটি আছে, সেটা দিয়ে আমরা ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে পৌঁছে যেতে পারি। আমরা পিছিয়ে পড়ছি, আমাদের দক্ষতার কমতিতে। অনেক আগে, ক্লাসে আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর মাসউদ স্যার বলেছিলেন, চীনে একটি উইভিং লুমে ১০ বছর ধরে একটানা ৪০/৪০ পপলিন কাপড় হচ্ছে। ওই লুমের কর্মী চোখ বুঁজেও সেটা চালাতে পারে। আর বাংলাদেশের একটা লুমে আজ পপলিন তো কাল টুইল, তো পরশু ক্যানভাস কাপড় চলে। বীম চেঞ্জ কর রে, মেশিন স্পেসিফিকেশন চেঞ্জ কর রে, গুচ্ছের হাঙ্গামা ! এফিসিয়েন্সি আসবে কোথা থেকে ? সত্যিকার এফিসিয়েন্সি চায়নার থাকবে না তো কি আমাদের থাকবে?
আবার ২০০৮ সালে আমি একটা বৃটিশ সোর্সিং অফিসে( Mothercare Sourcing UK) বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ছিলাম। একই সঙ্গে আমাকে ডুয়েল রোল প্লেয়ার হিসাবে গ্লোবাল সোর্সিং ম্যানেজার হিসাবে কাজ করতে হত। আমাকে নিরপেক্ষভাবে সব দেশের ( মূলত: ভারত, চীন ও বাংলাদেশ) মূল্য-তালিকা তুলনা করে অর্ডার প্লেস করতে হত।

কটন টি-শার্টে আমাদের চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্য আর কেউ দিতে পারবে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আমাদের সবচেয়ে বেশী দক্ষতার প্রোডাক্টে , মানে কটন টি-শার্টে—দক্ষিণ ভারতের কিছু কারখানা দারুণ কম্পেটিটিভ দাম দিয়ে বাংলাদেশের অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয়দের কে না চেনে ! এঁরা যা জানে না , সেটা বলে বেড়ায়, আর যেটা জানে সেটা কদাপি বলতে চায় না ! আমি জিজ্ঞেস করলাম , তোমাদের এতো ওভারহেড কস্ট, কাটিং মেকিং কস্ট , কিভাবে কটন-টি শার্টের দাম মেলাচ্ছ? যথারীতি কোন সদুত্তর পেলাম না।
আমাকে ওই সময়ে প্রায় প্রতি মাসেই ব্যাঙ্গালোরের Hub Office- এ মিটিং এ যেতে হত।এঁদের সঙ্গে খাতির টাতির করে, কারখানা ঘুরে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমাদের সেই সময়ে , কোন একটা গার্মেন্ট শিপমেন্টের আগে মূল কাপড়ের কনজাম্পসন-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ওয়েস্টেজ ক্যালকুলেটে করতে হত। সেটা ছিল, ধরেন একটা টি-শার্টের ক্যালকুলেটর কনজাম্পসন ২ কেজি ফিনিশড কাপড়। আমাদের দেশে এর সঙ্গে প্রসেস লস ( নিটিং , ডাইং ফিনিসিং ), কাটিং লস, প্রিন্টিং লস, অলটার ইত্যাদি ইত্যাদি ধরে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ পর্যন্ত অতিরিক্ত কাপড়ের বুকিং দেওয়া হত। তারপরেও দেখা যেত, প্রোডাকশনের মাঝখানে কাপড়ের শর্ট বুকিং আসছে। আবার নিটিং ডাইং, আবার অতিরিক্ত কাপড়। এতো কিছুর পরেও শিপমেন্টের সময়ে ১০০% শিপমেন্ট দিতে পারত না আমাদের কারখানাগুলো। অথচ, ভারতীয় কারখানাগুলো ভার্টিকাল সেটআপের না। এঁরা কাপড় নেয় এক জনের কাছ থেকে, সেলাই করে আরেক জায়গায়। ১০০ কেজি যদি মূল কনজাম্পসন হয় , তবে এঁরা ১০৩/১০৫ কেজি কাপড় বুকিং দেয়। মজার ব্যাপার সেই ১০৩ কেজি ফেব্রিক দিয়ে এঁরা ২% বেশী শিপমেন্ট দেয় ! এখন, আমাদের দেশের যে কোন একটা গার্মেন্টস-এর ন্যায্য দামের সঙ্গে ১৮ থেকে ২০ ভাগের এই যে অপচয়ের , অদক্ষতার মূল্য যুক্ত হচ্ছে—সেটার দাম ক্রেতারা কেন দেবে ?

প্রাত্যহিক কাজের ক্ষেত্রেও তাই। একজন ইউরোপীয় ৫ দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করে ৪০ ঘণ্টায় যে কাজ করছেন , আমাদের একজন মার্চেন্ডাইজার ৩ সপ্তাহেও তা করতে পারছেন না। আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে, যখন দেখি কেউ কেউ গভীর রাত পর্যন্ত মার্চেন্ডাইজিং করছেন। হ্যাঁ, ক্ষেত্র বিশেষে আপনাকে তা করতে হতে পারে, কিন্তু সেটা যখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়—আপনার এফিসিয়েন্সি নিয়ে ম্যানেজমেন্ট প্রশ্ন তুলতেই পারেন। হয় আপনার দক্ষতা কম অথবা আপনার সাপোর্টিং হ্যান্ড লাগবে।

কেন এই কথা বলছি, কারণ আমাদের বুড়ো প্রজন্ম কিন্তু গ্রাউন্ড লেভেল মার্চেন্ডাইজিং করে এই খানে উঠে এসেছি। আমাদের সময়ের কারখানার অদক্ষতা কি পর্যায়ের ছিল, সে আর কহতব্য নয় ! অনেকগুলো ঈদের দিনের ভোররাতে ট্রাকে শিপমেন্ট উঠিয়ে আমি বাসায় এসেছি। কোনমতে ঈদের জামাত ধরেছি, তারপরে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ওই ছিল আমাদের ঈদ-বিনোদন। সপ্তাহের ছুটির দিন নামকাওয়াস্তে ছিল শুক্রবার। তাও প্রতি শুক্রবারে ১০/১১টার মধ্যে বাকী কাজ শেষ করার জন্য আমাদের অফিসে যেতে হয়েছে। শুক্রবারে একটু দেরী করে ঘুম থেকে ওঠাই ছিল আমাদের সবচেয়ে আনন্দের ! সেই তুলনায় এখন এতো বেশী স্মার্ট লোকের সমাগমে কারখানা , ট্রেডিং অফিস সবার দক্ষতা অনেক অনেক বেড়ে গেছে।আপনাদের এই প্রজন্মকে গ্লোবাল কম্পিটিশনে টিকে থাকতে হলে, সময়োপযোগী প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হতে হবে। একই সঙ্গে নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে, এতে করে আমাদের পুরো ট্রেড উপকৃত হবে।

৭। নিজেকে গড়ে তুলুন নতুন নতুন তথ্য ও ট্রেনিং দিয়ে :
স্মৃতি থেকে লিখছি, সম্ভবত: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট Abraham Lincoln বলেছিলেন “Give me six hours to chop down a tree and I will spend the first four sharpening the axe.” ঠিক এই জায়গাটাই আমি নতুন প্রজন্মকে বলব। নিজের দক্ষতার কুঠারে ধার দিতে থাকেন। অলস সময়ে কোন একটা নতুন ভাষা শিখুন, MBA করা না থাকলে করে ফেলুন। যে কোন ট্রেনিং প্রোগ্রামে সুযোগ পেলে ট্রেনিং নিয়ে ফেলুন।সেদিন এক অনুজ ছোটবোন বলল, নতুন অফিসে যেখানে সে সদ্য যোগ দিয়েছে সেখানে নাকি কাজের প্রেশার আগের তুলনায় অনেক কম। সে তাই ফেসবুক বা অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি তাঁকে বললাম, এই সুযোগ কিছুদিন পরে নাও পেতে পার। কিছুদিন পরে তুমি হয়তো ভয়ংকর ব্যস্ততার মধ্যে পড়ে যেতে পার। তুমি কি MBA করেছ। সে না সূচক উত্তর দিলে , তাঁকে অনুরোধ করলাম, করে ফেলতে।

৮। নির্দিষ্ট সময় পরে নিজেকে এই কর্পোরেট জগতে কোথায় দেখতে চান:
এই প্রশ্নটা ক্লিশে (Cliché ) হয়ে গেছে। প্রতিটা ইন্টারভিউ বোর্ডে সবাই এই প্রশ্নটা করেন। আমার জন্য খুব অস্বস্তিকর ছিল, ২০০৭ সালে আমার বৃটিশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন আমাকে এই প্রশ্ন করে বসলেন । আমি কেন জানি না সাবলীলভাবেই উত্তর দিয়েছিলাম যে আমি যেহেতু লোক নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসি, আমার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে ডেলিগেট করতে ভালোবাসি ; ৫ বছর পর এখনকার ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বৃহদাকার কোন প্রতিষ্ঠান চালাতে চাই। ওয়েল , আমি সেটাই করছি এখন।
আরেকটি কথা আমি আমার অনুজদেরকে বলি। দয়া করে আপনি স্বার্থপরের মতো শুধুমাত্র নিজের জন্য কাজ করুন। কোম্পানির কথা , দেশের কথা আপনাকে চিন্তা না করলেও হবে। আপনার দক্ষতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যাতে করে আপনার বস আপনার ব্যাপারে খুশী থাকে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ এবং সারা মার্কেট-প্লেস যেন জেনে যায়, হ্যাঁ ওই যে একজন লোক – যাকে বিশ্বাস করা যায় যে কোন কাজ দিয়ে!

আমার CEO—একদিন খুব আন্তরিক ঘরোয়া পরিবেশে বলেছিলেন, ‘জাহিদ নিজেকে ব্র্যান্ড হিসাবে তৈরি কর। আমার প্রতিষ্ঠানের বাইরেও লোকে যেন এক নামে তোমাকে চেনে সেই ভাবে কাজ কর। আমি জানি, সবাইকে আমি আমার প্রতিষ্ঠানে সারাজীবন ধরে রাখতে পারব না। কিন্তু আমি ভীষণ গর্ব অনুভব করব, লোকের মুখে শুনতে যে তুমি TEX LINE -এর প্রোডাক্ট !’

৯। সব সমস্যা বসের কাছে ছুঁড়ে দিয়ে সমাধানের আশা করবেন না ; উনি ঈশ্বর নন:
নতুন প্রজন্মের কম্যুনিকেশন জ্ঞান খুব ভাল। কোন একটা সমস্যা হওয়ার সাথে সাথে তারে ই-মেইল রে, ফোন রে, মিটিং রে করে সারা দুনিয়ার ক্রেতা ও ঊর্ধ্বতনদের সেটা জানিয়ে দেয়। ঠিক আছে। কিন্তু , ওই যে বললাম সবাই সবসময় সমস্যার কথা শুনতে পছন্দ করে না। সমস্যা ছুঁড়ে না দিয়ে, সমস্যা কেন হয়েছে, সম্ভাব্য সমাধান কি কি হতে পারে , সেটা লিখে নিয়ে বসের কাছে হাজির হন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে সবচেয়ে সাশ্রয়ী অপশনটা আপনার জন্য বেছে দেবেন, আপনাকে গাইডলাইন দেবেন। এবং একই সঙ্গে আপনার এই কাজে তিনি খুশী হবেন; কেননা আপনি আর সবার মতো সমস্যা তাঁর দিকে ছুঁড়ে দেন নি। বরং সিদ্ধান্তগ্রহণে তাঁকে সাহায্য করেছেন।

১০। দায়িত্বগ্রহণে কখনই পিছপা হবেন নাঃ
আপনি নতুন, আপনার অভিজ্ঞতা নেই, পারবেন নাকি পারবেন না – এইসব ভেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণে পিছপা হবেন না। ম্যানেজমেন্ট প্রো-অ্যাক্টিভ লোক পছন্দ করেন। যোগ্য কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া লোক সামনের দিকে এগোতে পারেন না। সুতরাং অ্যাগ্রেসিভ হয়ে দায়িত্ব নিতে শিখুন। ভুল হবে, ঝামেলা হবে—আপনি নতুন কিছু শিখবেন।

১১। আপনার শক্তিমত্তাকে কাজে লাগান:
আপনার বস হয়তো কারখানার সঙ্গে বা সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গে হৈচৈ করে কাজ উদ্ধার করেন। অথচ আপনি একটু ভদ্র গোছের, মুখ খিস্তি করতে পারেন না। ওয়েল, সমস্যা নেই। আপনি যদি ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্র-ভাষায় কথা বলে কাজ উদ্ধার করতে পারেন , করেন। বিড়াল কালো না সাদা , তাঁর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিড়ালটি ইঁদুর ধরতে পারে কিনা।

১২। নিজেকে অর্গানাইজ করুন,প্রতিদিনের, সপ্তাহের, মাসের প্রায়োরিটি ঠিক করুন:
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, যেটি আমাদের কর্পোরেট জীবনে খুব কাজে লাগে। “If you are not scheduling your day by yourself, some others will do that !” আপনি সারাদিনে কি কি করবেন , সেটা আপনার একটা মাস্টার লিস্ট থাকতে হবে। সেটা দিনশেষে একটা ডাইরিতে লিখে রাখতে পারেন, অথবা অফিসে আসার সময়ে লিখে ফেলতে পারেন। ইদানীং স্মার্ট-ফোনে নানা অ্যাপ্‌স আছে, আপনি সেটার সাহায্য নিতে পারেন। আপনি যদি নিজের দিনকে প্রায়োরিটি অনুযায়ী শিডিউল করতে না পারেন। আপনার সারাদিনের কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেবে আপনার বস, অথবা আপনার ক্রেতা বা সাপ্লাইয়াররা। সারাদিন এঁদের নানাবিধ একটার পর একটা কাজে, ফোনে আপনাকে ব্যস্ত রাখবেন, যে সন্ধ্যার সময় গিয়ে আপনার নিজের কাজে মন দিতে হবে। সুতরাং সাধু সাবধান! নিজের দিনের শিডিউলের দায়িত্ব অন্যদেরকে দেবেন না। টেক কন্ট্রোল ।

১৩। আপনার বস, আপনার ক্রেতা বা সরবরাহকারী দিনশেষে কিন্তু একজন রক্তমাংসের মানুষ:
আপনার সারাদিনের কাজ কিন্তু যন্ত্রের সঙ্গে নয়। যাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন তাঁরা আমার আপনার মতোই মানুষ। তাঁরাও নিজের নিজের প্রতিষ্ঠানে, নিজের অবস্থানে নিজের মুখ উজ্জ্বল দেখাতে চান; মাস শেষে বেতন আর বছর শেষে ভাল প্রফিট শেয়ার চান। সুতরাং তাঁদেরকে আপনি সাফল্য অর্জনে সাহায্য করলে, তাঁরা আপনাকে সাহায্য করবেন। যে আচরণ আপনি আপনার নিম্নপদস্থদের কাছ থেকে আশা করেন না , সেটা আপনি আপনার আপার হ্যান্ড ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে করবেন না।
ধৈর্য ধরে আমার দুই পর্বের নবীন প্রজন্মের জন্য লেখা কর্পোরেট অব্‌জার্ভেশন পড়ার জন্য আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ।

[প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০১৬]

আমার শৈশবের যৌন শিক্ষা, আমাদের বেড়ে ওঠা ও আধুনিক বিকৃত প্রজন্ম

(পুরনো ও প্রিয় একটি লেখা, যা এই অস্বস্তিকর বাংলাদেশের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক।)

আজ সকালে কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ভাঙ্গাগাড়ীতে পুরনো সিডি খুঁজছিলাম, কিশোর কুমারের একটা বাংলা সিডিও পেলাম, চালু করতেই সেই ঐশ্বরিক দরাজ গলা বেজে উঠলো।
“তারে আমি চোখে দেখিনি , তার অনেক গল্প শুনেছি,
গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি।।
আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন,
বইতে পারে না তারও বিবশ মন ;
ভালোবাসার ভালো কথা শুনে নাকি শিহরিয়া যায় শুনেছি।।
চোখেতে তার স্বপ্ন শুনি ভীড় করে থাকে,
মরণ শুনেছি হাতছানি দিয়া ডাকে,
বিষের আবার ভালোমন্দ কীরে যখন আমি মরতে বসেছি !!! ”

কিশোর কুমার , মান্না দে আমাদের দুই প্রজন্ম আগের হলেও এঁদের গান আমাদেরকেও মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলাব্যান্ডের উত্থানের সমসাময়িক সময়ে ফিতা ক্যাসেটের যুগে এঁরাই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের।

গানের লাইনটি আবার খেয়াল করুন , ‘আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন, বইতে পারে না তারও বিবশ মন !’
দৃশ্যকল্পটি কেমন? যৌবন ছল্‌কে পড়ছে, উদ্ভিন্ন বাঁকগুলো আপনাকে মুগ্ধ করছে।
যদিও আমি আমার কন্যাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষারত , তারপরেও ভণ্ডামি না করে বলতে পারি, আমার ‘পুরুষ-চোখ’ কিন্তু ঠিক ঠিকই অতিক্রম কারিণী সকলের , যাঁদের যৌবন ছল্‌কে যাচ্ছিল তাদের দেখছিল।

বর্তমানের একাধারে নারীদের উপর নিরবচ্ছিন্ন যৌন নিপীড়নের হেডলাইন দেখতে দেখতে আমি বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। পুরুষ হিসাবে আমি লজ্জিত। মনোবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানা কুইক রেন্টাল টোটকা দিয়ে এই ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে উঠে আসার পথ , উত্তরণের বাৎলাচ্ছেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, পুরোপুরি উৎপাটন করা সম্ভব না হলেও এই অসুস্থতার সার্বিক নিরাময় সম্ভব। এবং সেটা শুধুমাত্র শৈশবে সঠিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে।

বালককে বুঝতে হবে, সে শিশ্ন-ধারী মানুষ ঠিক আছে, কিন্তু বালিকা শিশ্ন-হীন দ্বিতীয় লিঙ্গের দুর্বল কেউ না। বালককে নারীর মাহাত্ম্য বোঝাতে, নারীর মর্যাদা শেখাতে খুব বেশী সময় লাগারতো কথা না। বালকের মা আছে, বোন আছে, অন্য শ্রদ্ধেয়া আত্মীয়ারা আছেন। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে তাকে নারীর মর্যাদা শেখাতে হবে।
রহস্যময় দৈহিক বাঁক নিয়ে যে নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে একজন মানুষ এবং তোমার চেয়েও অধিকতম মানুষ। বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরুৎপাদনের বিশাল শারীরিক যন্ত্রণার দায়িত্ব প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে। বালককে বুঝতে হবে , বোঝাতে হবে নারী শুধুমাত্র স্তন ও যোনীর সমষ্টি একটা ভোগের বস্তু নয় !

পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাটা পেলে ভাল। নইলে শিক্ষায়াতনে। পরিবারের একজন পুরুষকে দেখলে প্রথমেই আমরাতো তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি না !
পোশাক, জুতা, আর্থিক-সামাজিক অবস্থা হেন তেনর পরে তার বিশাল বপু বা স্থূলত্ব নিয়ে কথা হয়।

কিন্তু একজন নারীকে দেখলে কেন প্রথমেই তাঁর স্তন ও নিতম্বের দিকে জুলজুলে নজর যাচ্ছে ? সমস্যাটা কোথায় ? তাঁর অন্যসব বৈশিষ্ট্য কেন আলোচিত হয় না ? একজন কিশোরী , তরুণী আমার সামনে এসে প্রথমেই কেন তাঁর বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকাঢাকি করা শুরু করে দেয়। কী তাঁকে ভীত করে তোলে, যে সামনের পুরুষটির ( হোক সে কিশোর, তরুণ , মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ) সামনে সে ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ! কে তাঁর মনে এই অ-নিরাপত্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে?

বাদ দিই, তাত্ত্বিক আলোচনা। সাহস বা দুঃসাহস করে যদি আমার প্রজন্মের যৌন শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করি , তাহলেও কী কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে না !

অন্য সকলের মতোই আমারও কৈশোরের অসহনীয় বয়ঃসন্ধির একাকীত্ব, দেহের অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা ছিল। ছিল মন খারাপ করা বিকেলবেলা। নিজেকে অপাঙতেয় , তুচ্ছ , অবহেলিত ভাবার দুঃসহ দিনরাত্রি। আমি মোটামুটি নজরে পড়ার মতো ভালো ছাত্র ছিলাম। পরিবারের ও শিক্ষকদের আলাদা একটা এক্সপেকটেশনের ভার আমাকে বইতে হতো। কিন্তু আমিও তো একটা কিশোর। আমার যে ছেলে বন্ধুটি , মেয়েদের স্কুলের সামনে যেয়ে সদ্য কিশোরীদের উদ্ভাসিত চাহনি, রহস্যময় বাঁক দেখে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করতো ,তাতে আমার মনটাও তো হু হু করে উঠতো।

সে ছিল এক কল্পনার রাজ্য। যদিও আমার শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির সমানুপাত বৃদ্ধির পরিমাপ নিয়ে আমার পরিবারে দ্বিধা আছে।আমার মানসিক বৃদ্ধি শরীরের তুলনায় শ্লথ। আমি স্তন্যপায়ী ছিলাম ৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এবং কেন জানিনা , আম্মাও আমার অত্যাচারকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন অতোগুলো বছর। বছর পাঁচেক পর্যন্ত আমার বেড়ে ওঠা নানাবাড়ি কুষ্টিয়াতে। অস্পষ্ট আবছা মনে আছে, হয়তো স্মৃতিতেই পুনঃ-নির্মিত হয়ে আছে। গ্রামের বাচ্চারা ছিল যৌনতার ব্যাপারে অকালপক্ব । সহচর-সহচরী খেলার সাথীদের হঠাৎ বাল্যবিবাহ, তাঁদের যৌনতার অভিজ্ঞতার নিষিদ্ধ আলোচনা তাদেরকে পাকিয়ে দেয়। কোনটা শিশ্ন, যোনি, স্তন, কোনটার কী কাজ, সেটা আমাদের সময়ে আমাদের গ্রামের খেলার সাথীরা ভালোই বুঝতো। পুরোপুরি নাগরিক হতে হতে ৭৯ সাল। প্রতি ঈদে পার্বণে নানাবাড়ি যেতে হোত, যৌন জ্ঞানের পার্থক্যটা তখন চোখে পড়ার মতো ছিল । মোরগ-মুরগী বা কুকুরের সংগমে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও গ্রামের শিশুদের জন্য সেটা ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ।

বছর সাতেক থেকে তেরো চৌদ্দ পর্যন্ত সেই অর্থে আমার যৌন চেতনা ছিলনা। অন্তত: আমার কিছুই মনে নেই।ক্লাস ফাইভে আমার সহপাঠিনী মিতু প্রেম করা শুরু করলো বা অধুনা যেটাকে বলে ক্রাশ খেল অপু নামের জনৈক নবম শ্রেণীর উদীয়মান গায়কের সঙ্গে। ওইটা আমার মনে আছে।

ক্লাস সিক্সে স্কুলের পরিবর্তন। স্কুল পরিবর্তনের পরে , নতুন স্কুলের পোলাপানের সঙ্গে এলোমেলো সখ্যতা গড়ে উঠল। ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয় সবাই আমার বন্ধু ছিল। সবাই আমাকে আপন করে নিল।

বাসায় মামা চাচা ও গ্রামের আত্মীয়স্বজন অপর্যাপ্ত। দুই বেডরুম,ডাইনিং বাসাতে মাসের বেশীরভাগ দিন আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্লোরিং করতে হোত। দেশের বাড়ির কেউ না কেউ, হয় চিকিৎসা নয় এয়ারপোর্ট বা চিড়িয়াখানা দেখতে বাড়িতে জিইয়ে থাকত।

বাসায় মামা , চাচা কেউ না কেউ যাওয়া আসার মধ্যে থাকতোই। তাদের ফিসফিসে নারীদেহ নিয়ে কথাবার্তা কানে বাজতো। হ্যাঁ, নারীর নগ্নদেহের ছবি একটা শিরশিরে অনুভূতি এনে দিত। মামা-চাচাদের কারো না কারো অসাবধানে বিছানার তোষকের তলায় ফেলে রাখা নিউজপ্রিন্ট ছাপার পর্ণ পত্রিকা হাতে পড়লো। বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সম্ভবত: অর্ধ-নগ্ন ছবির একসেট প্লেয়িং কার্ডও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন দেখেছিলাম। তো, প নামের এক নতুন স্কুল-বন্ধু স্বমেহনের ব্যাপারটা কেমন করে যেন মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আমি জানি না, আমার সব বন্ধুদের সবাই, হয়তো নিজে নিজেই স্বমেহনের আনন্দ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এটা কেই আমরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। এর মাঝে কেউ কেউ স্বমেহন যে খারাপ তা বলে তীব্র অপরাধ-বোধ ঢুকিয়ে দিল। এটা খুব খারাপ, পাপ হবে, শরীর শুকিয়ে খারাপ হয়ে যাবে, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইট পর্যন্ত যৌনমিলনের ব্যাপারে আমার জ্ঞানের পরিধি ছিল এই যে, শারীরিক মিলনে পুরুষাঙ্গ ও নারীর পায়ুপথ ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এইটের শেষের দিকে ক্লাসের অভিজ্ঞ ডেঁপো ছেলেদের জ্ঞান বিতরণে মানব-মানবীর শারীরিক মিলনের সব কিছু সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !

কিন্তু পড়াশোনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা , কৈশোরের একাকীত্ব স্বমেহনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল আমাকে ও আমাদেরকে।
এসএসসি পরীক্ষার পরপরই আমরা ঘোষণা দিয়ে বড়ো হয়ে গেলাম। এখন আমরা সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা কলেজ ছাত্র। এবং ‘জ’ নামের এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের প্রথম দলবেঁধে পর্ণ-ছবি দেখা। ঢাকা কলেজে ভয়ঙ্কর মেধাবী মেধাতালিকার বন্ধুদের ছড়াছড়ি। আমরা মিরপুরের ছেলেপেলে ছিলাম নিতান্ত মফস্বলী মফু । গভর্নমেন্ট ল্যাব: বা ধানমণ্ডি বয়েজের পেন্টিয়াম ভার্সনের পোলাপানের কাছে আমরা ছিলাম ডজ মুডের কম্পিউটার। একদিন কেউ একজন আমাদের মিরপুরবাসীকে জিজ্ঞাস করলো আমরা বাংলা পর্ণ বা চটি পড়েছি কীনা। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সে বললো , তোরা তো এখনও শিক্ষিতই হস্ নাই, আয় তোদের শিক্ষিত করি। তো ওই চটি পড়ে আমরা অদ্ভুতুড়ে কিছু পশ্চিমবঙ্গীয় যৌনাঙ্গের ও মিলন পদ্ধতির নাম শিখলাম। বেশীরভাগ পুস্তিকা বটতলায় ছাপানো, নীলক্ষেত উত্তম ভাঁড়ারঘর ছিল সকল কলেজ-গামী ছাত্রদের কাছে।

আমার ধারনা, আমাদের মানসিক গঠনে, ওই সামান্য তথ্য বিকৃতি তেমন দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলতে পারে নাই। সমাজ ও পরিবারের এক্সপেকটেশনের চাপ আমাদেরকে অনেকটা একমুখী করে রেখেছিল( স্বমেহনের ব্যাপারটা ছাড়া। পরবর্তীতে আমি পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, স্বমেহন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাপ আর স্বাস্থ্যভঙ্গের ভুল বিকৃত তথ্য যদিও আমার কৈশোরের একটা অংশ বিষময় করে দিয়েছিল। )

বয়েজ স্কুলে পড়লেও নানা কারণে কোচিং ও মহল্লার ভালো ছাত্র হওয়ার বদৌলতে সতীর্থ সমবয়সী বান্ধবী ছিল। কিন্তু ওদের মানসিক পরিপক্বতা ছিল আমার বা আমদের চেয়ে বছর দশেক এগিয়ে। সম্পর্কটা ছিল নিতান্তই বড়বোন-ছোটভাই টাইপের। বিকৃতিহীন স্বাস্থ্যকর।

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জীবনে নতুন করে কোন তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের সম্ভাবনা ছিল না।
যথারীতি কয়েকজন প্লেবয় বন্ধু ছিল, যাদের ব্যবহারিক জ্ঞান ওই পর্ণ-পত্রিকার গল্পের চেয়েও উত্তেজক ছিল। তারা তাদের যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলত। আমরা অবদমিত মন নিয়ে তাদের রোমাঞ্চের ও মৈথুনের শীৎকার শুনতাম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তারপরে তো বিবাহিত জীবন, ‘দারা পুত্র পরিবার , তুমি কার কে তোমার !’

স্কুলকলেজের ডেঁপো বন্ধুদের কেউ কেউ, ভিড়ের বাসে আরেকজনের সাথে ধাক্কা খেয়েছে বা ধাক্কা না খেয়েই কল্প গল্প বানিয়ে বলেছে এটা বোঝা মুশকিল ছিল । যৌনতার ব্যাপারে ওই বয়সটা ছিল, সবকিছু বিশ্বাস করার, হা করে শোনার।

আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা অ্যাভারেজ একটা ছেলের যৌন-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেকটা আমার মতোই। ছোটখাটো ভুল তথ্য ,স্বমেহন বা পর্ণ ছাড়া আমি কোন বিকৃতি দেখিনা।

কিন্তু এর মাঝে মধ্যবর্তী নতুন একটা বিকৃত প্রজন্ম এসেছে ; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, বা মাইক্রোবাসে তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করছে, তাদেরকে আমি চিনি না। দুর্ভাগ্য, এই বিকৃতদের সাথেই প্রতিমুহূর্ত বসবাস করতে হচ্ছে আমাকে আমাদেরকে !

[ প্রকাশকালঃ ১৪ই জুন,২০১৫ ]