by Jahid | Nov 30, 2020 | সাম্প্রতিক
গত কয়েক দশকের মহামারী- সার্স, বার্ড ফ্লু, মার্স, জিকা, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু সব ভাইরাসেই মৃত্যু আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এইবার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মৃত্যুশঙ্কার চেয়েও বড় আতঙ্ক বোধকরি সামাজিক সন্মান ।
ইংল্যান্ডের প্রিন্স চার্লসের হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের হয়েছে, হলিউডের অস্কার জয়ী টম হ্যাঙ্কসের হয়েছে। আমাদের মিডিয়া সেটা ফলাও করে প্রচারও করেছে। বাংলাদেশের কারো হলে তাঁর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে সেতো পাগলেও বোঝে। সেই অর্থে সে যে অচ্ছুৎ সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের এতো সামাজিক গোপনীয়তার কারণ কী হতে পারে ! কুশিক্ষা আর অমানবিকতা !
কোভিড ১৯ কারো হলে মনে হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি বোধহয় খুব জঘন্য কিছু করে এই রোগ বাঁধিয়েছে !
নব্বইয়ের দশকে আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজে সমকামী ও পতিতাগামী এইডস রোগীদের যেভাবে দেখা হতো , কোভিড ১৯ রোগীদের সেইভাবে দেখা হচ্ছে। এই সামাজিক অবমাননার কারণে অনেকে চেপে থাকতে চাচ্ছেন রোগটিকে । মহল্লায় মহল্লায় গুজব আর বাঁশ নামিয়ে লকডাউনের ছড়াছড়ি হচ্ছে।
ব্যতিক্রম যে নেই তা না ; উচ্চশিক্ষিত যাঁদের হয়েছে, সুস্থ হচ্ছেন, যেমন বিএসএমএমইউ এর সাবেক উপ-উপাচার্যের করোনা থেকে রোগমুক্তির কথা টিভিতে দেখলাম। এই ডাক্তার ভদ্রলোক ও তাঁর কন্যা জানেন, এটা তাঁদের সামাজিক সন্মানের সঙ্গে জড়িত কিছু নয় মোটেও।
অথচ এই অতিমিডিয়ার যুগে করোনা ভাইরাস একজন আক্রান্তের যা কিছু অর্জন সেটা ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে, । কেউ আক্রান্ত হয়েছেন এটা তার চেয়েও তার পরিবারের জন্য বেশি বিড়ম্বনার, আতঙ্কের ও যন্ত্রণার মনে হচ্ছে।
প্রকাশকালঃ ২৬শে এপ্রিল,২০২০
by Jahid | Nov 30, 2020 | সাম্প্রতিক
ফোন করে কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি।
কেমন আছি?
দিনগুলো কাটছে হাসপাতালের ডিউটির মতো।
জীবনে কয়েকবার প্রিয়জনের জন্য হাসপাতালে ডিউটি দিতে হয়েছে। মূলত: তেমন কিছু করার থাকে না ;ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরের বারান্দায়, বেঞ্চে, চেয়ারে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত গভীর হতে থাকে। মানুষের আনাগোনা কমে । সিনিয়র ডাক্তাররা চলে যায়, ডিউটি ডাক্তার যাওয়া আসা করে । হাসপাতালের ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধ নানা ওষুধের সঙ্গে মিশে কেমন দমবন্ধ একটা গন্ধ তৈরি করে। সেই গন্ধে আমি ঠিক বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না। দূরের আবছায়া আলো-অন্ধকারে গাছগুলো মাথা দুলিয়ে চলে। করিডোরের মৃদু আলো। হয়তো মশা থাকে , ভ্যাপসা গরম থাকে । সবকিছুর উপরে থাকে একটা অনিশ্চিত অস্বস্তি। যে অস্বস্তি আমাকে ভাবায় -আবার কী স্বাভাবিক দিন ফিরে আসবে! যে প্রিয়জন শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায় তাঁকে নিয়ে কবে ফিরতে পারব বাসায়। কবে?
সামান্য কিছুতেই বিরক্তি চলে আসে। দারোয়ান ব্যাটা ঝিমায় কেন, ওকে টাকা দিয়ে রেখেছেই বা কেন? অন্য রোগীর অ্যাটেন্ডেন্ট এতো উচ্চস্বরে কথা বলে কেন ? নার্সটা এতো বেঢপ কেন? কাউকে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে কাছে আসে না কেন? আমার প্রিয়জন কেমন আছে, জিজ্ঞেস করার কাউকে খুঁজে পাই না কেন? হাসপাতালে সামান্য নিয়ম কানুনও নেই কেন? কর্তৃপক্ষ এতো উদাসীন আর দায়িত্বজ্ঞানহীন ! নানা ধরণের অর্থহীন অভিযোগ আর অপ্রয়োজনীয়তায় খচখচ করে।
সারারাত হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা মানে তো জাগতিক সব প্রয়োজনীয়তার বাইরে কর্মহীন থাকা। কিন্তু সেই কর্মহীনতা আমাকে আরো বেশি করে শুষ্ক করে, ক্লান্ত করে, অবসন্ন করে। মনে হয় আমি একটা বিস্তৃত জীবনহীনতার ভেতরে আছি। জানি , আমার আরো অনেক প্রিয়মুখ আছে, কিন্তু আমার তো ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে। সময় বয়ে চলে, একেক মিনিট মনে হয় একেক দুঃসহ ঘণ্টার মতো। আমি না পারি কিছু খেতে , না পারি ঘুমাতে। একটা ক্ষীণ জৈবিক দুরাশা , হয়তো একসময় বাসায় যেতে পারব, গোসল করে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারব। কিন্তু আমার হৃদয়ের অংশ আমার সবচেয়ে প্রিয়জনদের কেউ শুয়ে আছে ঐ দূরের বিছানায় ; জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আর আমি কীনা ভাবছি দুটো ভালো খাওয়ার , একটু ঘুমের ! কেমন একটা অপরাধ বোধ আচ্ছন্ন করে আমাকে । তবুও নিজের বিছানার জন্য মনটা আকুল হয়।
ভোর হয় না। কিন্তু মনে হয় , অন্য আলোর আবছায়া দেখা যায় হাসপাতালের জানালায়। পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যায় কী ! আমি বসে থাকি একা ,নতুন ভোরের অপেক্ষায় !
প্রকাশকালঃ ১৯শে এপ্রিল,২০২০
by Jahid | Nov 26, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
ক্লাস সিক্সে থাকতে পড়েছিলাম, ‘Live your life in a way ; so you don’t have to hide your diary!’ ‘জীবনকে এমনভাবে যাপন করুন, যাতে আপনার ডায়েরী লুকোতে না হয়!’
স্কুলজীবনে কিভাবে কিভাবে যে দিনলিপি বা ডায়েরী লেখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল কে জানে ! সুবিধা ছিল ছোট্টমনের ব্যকুল কথাগুলো পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারতাম। মনের ভার কমে যেত।সেদিন দেখি কাঁচা হাতের লেখায় কয়েকটা ডায়েরী এখনো বুকশেলফের কোনায় পড়ে আছে। উল্টেপাল্টে দেখলাম, পড়াশোনার কথা, পরীক্ষার কথার সঙ্গে কিছু ছড়া-কবিতাতে ভরা। উচ্চমাধ্যমিকে উঠে পড়াশোনার চাপ ও নানাবিধ কারণে দিনলিপিতে আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
মিরপুরের আমাদের বাড়ীটি ছিল খানিকটা লঙ্গরখানার মত। আব্বা এবং আম্মা দুজনেই ছিলেন গ্রামের বাড়ীরে সঙ্গে ঢাকার একমাত্র যোগসূত্র। ঐদিকে বড়মামা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। প্রশাসনিক নানা কাজে দলবলসহ ঢাকার ছোটবোনের বাড়ীতে আসতেন। নিকট ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়রাও আসতেন বিদেশ-গামী কাউকে বিদায় দিতে। কেউ আসতেন শুধুমাত্র ঢাকা শহর দেখতে। এয়ারপোর্ট দেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশু-পার্ক , বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা ছিল অন্যতম বিনোদন-স্থান। চিড়িয়াখানা আমাদের বাসা থেকে মাইল তিনেক দূরে , সুতরাং আমাকে গাইডের ভূমিকা নিতে হত। অসংখ্যবার চিড়িয়াখানা যেতে যেতে এমনটি হয়েছিল, আমি চোখ বুজে হেঁটে হেঁটে বলে দিতে পারতাম বানরের খাঁচার ডানপাশ দিয়ে কত পা গেলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খাঁচা।
মেহমানদের অগ্রাধিকারে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো নিজের বিছানা তাঁদেরকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে ফ্লোরিং করতে হত। মেহমান থাকলে খুশীই হতাম। সকালের নাস্তায় রুটির জায়গায় পাকোয়ান ডালডা ভাজা পরোটা, হালুয়া,ডিমভাজা, গরুর মাংস ইত্যাদি।নাস্তা শেষে আম্মার হাতের সেই অসাধারণ দুধ চা। মেহমানের বিদায়ের আগের দিন একপ্রস্ত পোলাও মাংসের ফিস্ট অবধারিত! ওই সময়ে যেহেতু ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল, হয়তো মেহমানের উৎপাত নিয়ে কিছু একটা বেফাঁস লিখে রেখেছিলাম নিতান্তই ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি হিসাবে। অন্যের ব্যক্তিগত দিনলিপি পড়াটা অভদ্রতা সেটা আমি জানতাম ; আমার বড়মামা জানতেন না বা মানতেন না। উনি সেই ডায়রি অন্য সবাইকে পড়ে শুনিয়ে সে এক কেলেঙ্কারি !
ফেসবুককে কিছুটা সাম্প্রতিক তথ্যের মুচমুচে ম্যাগাজিন, কিছুটা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, কিছুটা লিটল ম্যাগাজিনের সুস্বাদু সাহিত্যের এবং সর্বাংশে ব্যক্তিগত দিনলিপির একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়। আমি ব্যক্তিগত দিনলিপির স্বগতোক্তির জায়গাটা ওইভাবেই প্রকাশ করি, যাতে স্বচ্ছতা থাকে বিব্রত না হতে হয়।
মূলত: মনুষ্য চরিত্র তেমন দুর্বোধ্য নয়। সামাজিকতার আত্মপ্রকাশে সে চাইবে সবচেয়ে সুশ্রী পোশাক, চেহারা ও আচরণে নিজেকে প্রকাশিত করতে। সেই রঙিন আলোর হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় আড়ালে ভঙ্গুর, একাকী,রিক্ত,ব্যর্থ-পরাজিত মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল !
প্রকাশকালঃ ২৩শে নভেম্বর,২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য