by Jahid | Dec 1, 2020 | সাম্প্রতিক
কয়েকদিন ধরে উত্তরা ৭ নং সেক্টরে আমি যে অফিসে কর্মরত, তাঁর চারপাশের রাস্তা ঢাকা ওয়াসা খুঁড়ে মিসমার করে ফেলেছে। আমার কর্মস্থলে আসতে একেক দিন গোলকধাঁধার মতো একেক রাস্তা ঘুরে আসতে হচ্ছে।
শীতের আগে একটা বৃষ্টি হলেই খোঁড়া রাস্তাগুলো হাকিম আলীর মৎস্য খামার হয়ে যাবে। আর দুয়েকদিন কাজ স্থগিত রেখে কন্ডাক্টর যদি ওয়াসা-ভবনে বিলের জন্য ঘোরে ; সেই দুইদিনে এডিস মশাদের প্রজননে বিশাল উপকার করা হবে। উপকৃত মশার কামড়ে উত্তরাবাসী ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেয়র থেকে শুরু করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও শাপশাপান্ত করবেন।
প্রায় চারবছর পর নানা কাহিনীর পরে উত্তরার রাস্তাগুলো একটু ভদ্রোচিত অবস্থায় এসেছে। কিন্তু , বছরের পর বছর রাস্তা ঠিক থাকলে তো প্রবৃদ্ধি হবে না সোনা !
মাস দুয়েক হলো না , শুরু হয়ে গেছে খোঁড়াখুঁড়ি ; রাস্তা খোঁড়ার মোচ্ছব।
এই মাসে ঢাকা ওয়াসা খুঁড়ছে , কাজ শেষে দায়সারা গোছের মেরামত করে এরা চলে যাবে ; তার ঠিক দুইমাস পরে বিটিসিএল বা বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মনে হবে খোঁড়ার কথা।
আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার না। তবে নাগরিক বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে এটুকু বুঝি যে–একটা রাস্তা প্রথম একটানে নানা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে টেকসই করে করার পর, সেটা খুঁড়ে মেরামত করলেও সেই রাস্তার না থাকে কোন শক্তি; না থাকে সৌন্দর্য। দিন কয়েকের ভারী বর্ষণে যাচ্ছেতাই হয়ে যায়।
আশেপাশের অনেকের এবং আমার নিজেরর সহধর্মীনিরও ‘সি-সেকশন’ করে সন্তান জন্মদান করতে হয়েছে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্মদানের কোনরকম চেষ্টা না করেই যথেচ্ছ অপ্রয়োজনীয় ‘সি-সেকশন’ কেন করা হচ্ছে, তার পক্ষে বিপক্ষে চিকিৎসক , সুশীল সমাজ ও নারীবাদীরা তর্ক করেই যাচ্ছেন। সে আরেক বিতং। কিন্তু, সিজারিয়ান অপারেশন করার পর, প্রসূতি নারীর সার্বিক স্বাস্থ্য আর তলপেটের চামড়ার স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যায়। সিনেমার কোটি টাকার নায়িকাদেরও সন্তান হয় শেষ বয়সে এসে, হয়তো ‘সি-সেকশন’ করেই হয়। কিন্তু তারা তাদের উন্মুক্ত তলপেটে মসৃণ রাখার জন্য চিকিৎসা ও ডায়েট করে হুলস্থূল করে। সেটা কী আমার গিন্নীর বা আপনার গিন্নীর পক্ষে সম্ভব ? ইচ্ছে করলেই বড়ো শতাংশের অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন যে এড়ানো যায়, সে কথা এখন সবাই বুঝতে পারছে।
তো, উত্তরার মসৃণ রাস্তায় এখন ‘সি-সেকশন’ চলছে।
চিন্তা করবেন না, দায়সারা মেরামত হবে দুইমাস পরে ; পানি জমবে, মশা হবে, রিকশা উল্টে পড়বে।
যারা একটা সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাদের অনেকেই তো উত্তরাতেই থাকেন।
তারা সহ সবাই গালি দেবেন মেয়রকে, রাষ্ট্রকে।
আর কমিশনের টাকা দিয়ে আরেকটা ফ্ল্যাট কিনবেন, বাচ্চার জন্য আলাদা গাড়ী বরাদ্দ করবেন। ভালো রাস্তা কেটে ভাঙ্গাচোরা এই ‘ এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই! ’ প্রক্রিয়াকে দোষারোপ না করে ; এসি গাড়ির ভিতর থেকে বসে বলবেন, ‘নাহ্ ! এই দেশের কোন আশাভরসা নেই। বাচ্চাগুলোর এ-লেভেল শেষ হলেই খালা-মামা-চাচার কাছে আমেরিকায় অথবা কানাডা পাঠিয়ে দেব।’
পাঠ করার জন্য ধন্যবাদ।
প্রকাশকালঃ ১৬ই অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সহজে বিশ্বাস করতে চাই না । মুসলমানদের সকল দুর্দশার জন্য দায়ী ইহুদি অথবা বাংলাদেশের সকল অস্থিরতা আর অরাজকতার জন্য দায়ী ভারত ; মৌলবাদীদের সকল উত্থানের পিছনে শুধুই পাকিস্তান—এই সব আমার কাছে বড্ডো ক্লিশে মনে হয় !
দিন কয়েক আগে এক সাংবাদিক বন্ধু তাঁর এক দেশি-বিদেশী নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডার কথা শেয়ার করছিল। তাঁদের আলোচনায় নাকি একটি প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী বাস করে বড় শহরগুলোতে। হোক সে দিল্লী, ঢাকা অথবা অন্যকোন মহানগরী ! রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুষঙ্গ যারা , তারা নাকি চায় , এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সকালের ট্রাফিকে ক্লান্ত হয়ে থাকুক সারাদিন ; আর সন্ধ্যার ট্রাফিকে আরো বেশি ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে নির্জীব হয়ে পড়ে থাক পরের দিনের ট্রাফিকের অপেক্ষায়।
তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোতে ট্রাফিক দূরীকরণ হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বনিম্ন প্রায়োরিটি।
রাষ্ট্রযন্ত্র চায় ট্রাফিক দীর্ঘমেয়াদে থাকুক ! অথবা তারা চায় ট্রাফিক এতো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হোক, যে তার সময়োপযোগী সুফল জনগণের কাছে থাকুক চির অধরা। শুনেছি ব্রিটিশ রাজের সময়ে জেলখানার কয়েদীদের খাবারে চুলকানির উপাদান মিশিয়ে দেওয়া হত। জেলের পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ আর অখাদ্য খেয়ে রাজবন্দী থেকে শুরু করে সকল কয়েদী অসুস্থ হয়ে থাকত, নির্জীব হয়ে পড়ে থাকত। নিজের শরীর যেখানে চলে না, সেখানে একজন কয়েদী আর স্বাধীন ভারতের জন্য কতোখানি চিন্তা করতে পারবে ! বিশ্বাস করতে চাই না, তবু ঐ যে বললাম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব– বন্ধুর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও বোধহয় ব্রিটিশ রাজের কয়েদীদের মতোই অবস্থা !
আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদদের নানা ধরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ফাইলবন্দী হয়ে উইপোকা খায় ! রাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে আছে স্বল্পমেয়াদের ফ্লাই ওভার নিয়ে। সমন্বয়হীনতা এমন পর্যায়ে যে, একটা রাস্তা দুই বছরের মধ্যে তিনবার পিচঢালাই আর ফুটপাত টাইলস দিয়ে সারা হয় তো আর চারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখা হয় জনগণের অসহায়ত্বকে একেবারে মাটিতে পিষে থেঁতলে ফেলা দেখার বীভৎস আনন্দে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে দীর্ঘমেয়াদের টেকসই ঢালাই রাস্তার কথা বলেছেন কয়েকবার ; অথচ সেই প্রকল্প ফেলে রেখে সবাই মিলে উঠেপড়ে লেগেছে এই বর্ষাপ্রবণ কাদামাটির দেশে পিচের রাস্তার বাইরে কোনকিছু না করতে !
মিরপুরের কালসি থেকে যে নতুন ফ্লাইওভারটি সরাসরি ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে যোগ দিয়ে হোটেল র্যাডিসনের সামনে গিয়ে অথবা কুড়িল ফ্লাইওভারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল — সেটা এখন হুট করে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে সড়কের জ্যাম চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে ! এবং এটা নাকি করা হয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে।
এভাবে সরকার প্রধানের সদিচ্ছাকে নিজেদের হীন স্বার্থে জলাঞ্জলি দিতে এতোটুকু দ্বিধা করছে না রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল নিয়ামকরা। যে দেশে নগর পরিকল্পনাবিদদেরই সামান্যতম মূল্যায়ন নেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ; সেই দেশে সাধারণ জনগণের আহাজারি কী করে পৌঁছাবে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে !
প্রকাশকালঃ ২রা মার্চ,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
বিষয়টি একটু স্পর্শকাতর মনে হতে পারে। যেহেতু এটি একটি বাস্তবতা এবং আমাদেরকে প্রাত্যহিক এই পরিস্থিতির সম্মুখীন সবাইকে কমবেশি হতে হয় ; তাই কয়েকটা কথা বা আমার নিজস্ব অব্জার্ভেশন সবার সঙ্গে শেয়ার করা মনে হয় অনুচিত হবে না।
ঢাকাকে নগর, মহানগর বা মেগাসটি বলা হলেও, এর সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা এবং অত্যল্প মফঃস্বল শহর থেকে আসা জনগোষ্ঠী। যেমন আমার আব্বা ৬০-এর দশকেই জীবিকার টানে গ্রাম থেকে ঢাকাতে চলে আসেন। কিছুদিন ডেমরার মাতুয়াইলের সরকারী স্কুলের শিক্ষকতা, তারপর আবহাওয়া অফিস, এদিক সেদিক করে ৬৫/৬৬ এর দিকে চলে যান তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচীতে। আম্মার সঙ্গে বিয়ে ৬৮-তে। বিয়ের পরে আম্মা আব্বা করাচীতে বছর খানেক থাকেন। ভাইয়ার জন্ম আমাদের জেলায়। আম্মার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর ঘাঁটি গাড়েন পুরনো ঢাকার ওয়ারীতে। আমার জন্ম মাতুয়াইলে, ডেমরাতে। সেই হিসাবে আমি হচ্ছি ঢাকা শহরের গ্রাম থেকে আগতদের দ্বিতীয় প্রজন্ম।
উঠতি নিম্নমধ্যবিত্ত হিসাবে আব্বাকে কেন্দ্র করে আমাদের পুরো পরিবারের বেড়ে ওঠা। অসচ্ছলতা ও আর্থিক অনটনের পাশাপাশি আব্বা তাঁর অন্যান্য ভাইবোনদেরকেও ধীরে ধীরে ঢাকা-মুখী করে তোলেন।
দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসাবে আমার স্কুলের সময়টিতে ঢাকার স্থায়ী, অস্থায়ী বন্ধুদের সঙ্গে কয়েকজন মফঃস্বল আগত বন্ধু ছিল। কেউ হয়তো সদ্যই বড়ভাইয়ের বাড়িতে থেকে পড়তে এসেছে। সিংহভাগ সহপাঠী ছিল ঢাকার স্থায়ী অথবা অস্থায়ী বাসিন্দা। সেই অর্থে মফঃস্বলের ছেলেদের সঙ্গে আমাদের তেমন কোন মিথষ্ক্রিয়া ছিল না।স্কুল পেরিয়ে ঢাকা কলেজে পড়তে গিয়ে জেলা শহরের দুর্দান্ত মেধাবী ছেলেদের সঙ্গে পরিচয়। সেখানেও এতো কম সময় থাকতে হয়েছে, ঠিকমতো পরিচয়ের আগেই আমাদের সবাই এখানে ওখানে ছিটকে পড়েছি। টেক্সটাইলে ভর্তি হওয়ার আগে কিছুদিন ছিলাম রসায়ন বিভাগে। প্রথম ক্লাসে শিক্ষিকার জিজ্ঞাস্য ছিল, কে কে কোথা থেকে এসেছে এবং তাঁদের জীবনের লক্ষ্য কি। মফঃস্বলের ছেলেরা বেশ সপ্রতিভ-ভাবে উত্তর দিলেও আমরা ঢাকার গুটি কয়েক আমতা আমতা করলাম। মূলত: আমাদের সবার লক্ষ্য তখনো আবার বুয়েটে পরীক্ষা দেয়া। সে কথাতো আর ম্যাডামকে বলা যায় না ! রসায়ন বিভাগ ডঃ হুমায়ূন আহমেদের মতো ছাত্র পেলেও আমাদের সময়ের পদার্থ বা রসায়ন নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে কারো আকাঙ্ক্ষিত সাবজেক্ট হওয়ার কথাও না।
কেমিস্ট্রিতে পড়ার খুব সামান্য সময়ে বেশ কিছু মফঃস্বলের মেধাবী ছেলেদের সঙ্গে মিশে আমি কীভাবে যেন বুঝে ফেললাম এঁরা দারুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে তাঁদের সঙ্গে আমার মূল মিথষ্ক্রিয়া ও বন্ধুত্বের সুযোগ ঘটল টেক্সটাইলের শহীদ আজিজ হলে ; এঁদের সংগে দীর্ঘ ৫/৬ বছর কাছাকাছি বিছানায় ও আড্ডা মেরে সময় কাটিয়ে। ক্লাসের শুরুর দিকে এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হল সে উপজেলার দুঁদে ছাত্র। কথায় কথায় তাঁর জীবনের লক্ষ্য শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁর ইচ্ছে টেক্সটাইলে পড়াশোনা করে সে কিছুদিন চাকরি বাকরি করবে, তারপরে নিজেই ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হবে।পড়াশোনার পাশাপাশি টেক্সটাইলের ঘরোয়া রাজনীতি করবে সে এবং পরবর্তীতে সে জাতীয় রাজনীতিতে যোগদান করে দেশের মূল শাসন ব্যবস্থায় অংশ নেবে।
আর আমাদের ঢাকার কয়েকজন তখনো এই হুতাশন নিয়ে ব্যস্ত, কই আসলাম, কেন আসলাম , কোথায় যাচ্ছি—এই সব নিয়ে। পরবর্তীতে আমার ঐ বন্ধুটি ঠিকই আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বৃহত্তর প্রকৌশলীদের সংগঠনে জড়িত হয়ে পড়েছে। মাত্র কিছুদিন চাকরি করেই ব্যবসা শুরু করেছে সে এবং আমার ধারণা সে তাঁর ঠিক লক্ষ্যেই আছে। দুই যুগ আগে থেকেই সে জানত ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল তাঁকে কি কি অর্জন করতে হবে। আর আমি এখনো এই চল্লিশোর্ধ বয়সে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগে চলেছি !
মূল কথায় আসি। কর্পোরেট জগতে, ঢাকার বাসিন্দা ও মফঃস্বলের আগতদের মানসিকতা ও কাজের ধরণে একটা বড় পার্থক্য চোখে পড়েছে আমার। যেহেতু, আমি ঢাকার দ্বিতীয় প্রজন্ম , আমার কথায় পক্ষপাতিত্ব থেকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকছেই। তবু যতোখানি পারি নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার চেষ্টা করি।
মফঃস্বলের যে মেধাবী তরুণটি আরো হাজার-খানেক ছেলেকে পিছে ফেলে ঢাকা শহরের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসছে, সে কিন্তু তাঁর ছোট্ট পরিমণ্ডলে পরিবার ও পরিপার্শ্বের কেন্দ্রবিন্দু। গ্রামের অমুকের ছেলে তমুক কি করেছে, বা জেলা শহরের আরেক মেধাবী কতখানি সাফল্য অর্জন করেছে, সেটা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। নিজের ভিতরে একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার আগুন দপদপ করতে থাকে। আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, জেলা শহরের বা গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি ছিল তাঁর স্কুলের ব্যাঘ্র-শাবক। সুতরাং তাঁর হুংকার হয়তো নাগরিক রাস্তায় ম্রিয়মাণ হয়ে আসে। কিন্তু নিজের আসল পরিচয় সে কোনভাবেই ভুলে যেতে পারে না।
নানাবিধ কারণে মফঃস্বলের তরুণেরা দুর্দান্ত কর্মঠ হয়। ঢাকার তরুণদের হয়তো থাকার একটা সংস্থান আছে, তাঁকে কিন্তু মেসে বা হোস্টেলে সংগ্রাম করে থাকতে হচ্ছে।
ঢাকার তরুণটির হয়তো কেউ না কেউ বড়ভাই, মামা-চাচা আছে কোন খোঁজ খবর দেওয়ার ও নেওয়ার। ঐ তরুণটিকে কিন্তু ‘এসো নিজে করি’ স্টাইলে সব নিজেকেই করতে হচ্ছে। গ্রামের বা মফঃস্বলের বাবা-মার তাঁকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার অবস্থা নেই।
মূলত: ঢাকার তরুণদের মাঝে কিছুটা গা ছাড়া উন্নাসিকতা থাকে, ‘ দেখি কী হয়’ টাইপের। তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ফোকাস থাকে চাকরি বাকরি করে মোটামুটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো। অমুকের মতো হতে হবে, তমুকের মতো উপরে উঠতে হবে, খুব দ্রুত একটা থাকার সংস্থান ফ্ল্যাট করতেই হবে, গাড়ী না থাকলে চলছেই না—তেমনটি ঢাকার তরুণদের কিছুটা কম থাকে।
আমার সংক্ষিপ্ত চাকরির সময়কালে, ঢাকার সংখ্যা গরিষ্ঠ ছেলেদের, আমি আবারো বলছি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছেলেদের( ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে), ভিতরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অ্যাগ্রেসিভনেস মফঃস্বলের তরুণদের তুলনায় কম দেখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মনিষ্ঠতায় , বসের আস্থা অর্জনে, কর্পোরেট মইয়ের ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মফঃস্বলের তরুণদের ডেডিকেশন থাকে প্রশ্নাতীত। এই সব ক্ষেত্রে মালিক-পক্ষ ও সিনিয়র ম্যানেজাররাও তাঁদেরকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে থাকেন, এগিয়ে যেতে দেন। বলা-বাহুল্য অনেকাংশে সবাইকে পিছে ফেলে উপরে ওঠার এই প্রবণতা ভুক্তভোগী অনেকের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যে কোন বিজয়ের জয়-রথে রাস্তার পাশের ছোটখাটো লতাগুল্মের পিষ্ট হওয়ার শঙ্কা সব ক্ষেত্রেই থাকে।
আমার কাছে মনে হয়েছে ,একইভাবে ঢাকার কোন একজন তরুণ যখন প্রবাসী হয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে বসতি গড়ে– তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওই এলাকার স্থানীয় যে কোন তরুণদের চেয়ে বেশীই হবে। তাই আমি পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বাভাবিক ও আশাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই দেখছি।
প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১৬
by Jahid | Nov 28, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল, সাম্প্রতিক
কয়েক দশকে ঢাকা শহর অগুনতি বিল্ডিং, শপিং মল দিয়ে ভরে গেছে।
ইদানীং রাস্তায় বের হলেই শুধু চোখে পড়ে ঝকঝকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল আর ফার্মেসি ! ফার্মেসিগুলোতে সারি সারি র্যাক ভর্তি ঔষধের প্যাকেটে ; নানা বর্ণের, নানা মাপের, নানা কোম্পানির !
অথচ শহর খুঁজে শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য একখণ্ড সবুজ পার্ক চোখে পড়ে না। অথচ দু’দণ্ড বসে মনের অবসাদ দূর করার জন্য একটা পাঠাগার নেই। বিকলাঙ্গ শরীর ও মনের জন্য কিছু নেই বলেই আগামীর ঢাকা শহর শুধুমাত্র বিল্ডিং , হাসপাতাল আর ফার্মেসির শহর !
প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন,২০১৭
by Jahid | Nov 28, 2020 | সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
আমাদের স্কুলজীবনে আশির দশকেও ঠিক বর্ষাকালের আগেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ঘুমন্ত সংস্থাগুলোর মনে পড়ে যেত সারাবছরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো তাদের বাকী রয়ে গেছে ! তখন বিপুল উৎসাহে এরা ঢাকার রাস্তাগুলো খোঁড়াখুঁড়িতে মনোনিবেশ করত। আমারা দেখতাম, জুলাই, আগস্ট মাসের শেষের দিকেও কী গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সংস্থাগুলো ঝকঝকে রাস্তাগুলো এলোপাথাড়ি খুঁড়ে খুঁড়ে সবার জীবন কী পরিমাণ দুর্বিষহ করে রাখছে।
সেই সময়ে মহল্লার এক বড়ভাই রসিকতা করে বলছিলেন, যেভাবে এরা গভীর মনোযোগ দিয়ে রাস্তা খুঁড়ছে , মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি ‘তেল’ আবিষ্কার করে ফেলবে ! এই ‘তেল’ হচ্ছে তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলিয়াম তেল অর্থে। খোঁড়াখুঁড়ি শেষে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো দীর্ঘ শীত-নিদ্রায় চলে যেত। পুরো বর্ষাকাল থইথই পানিতে রাস্তার খানাখন্দ ভরে থাকতে থাকতে সেগুলো নদীমাতৃক পলিমাটিতে ভরে যেত। শীতের শুরুতে সেই ভাঙাচোরা রাস্তার উপরে দিয়ে গাড়িঘোড়া চলতে চলতে ধূলোয় ধোঁয়ায় নাগরিক জীবনে ব্রংকাইটিস-হাঁপানির আয়োজন হতো !
তিন দশক পরে এসেও এই সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা একইরকম রয়ে গেছে। অথর্ব এই সংস্থাগুলো সারা ঢাকার শহর খুঁড়তে খুঁড়তে পেট্রোলিয়াম তেল বের করতে না পারলেও, আমাদের মতো সাধারণ জনগণের তেল যে বের করতে পারছে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ !
প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন,২০১৭
সাম্প্রতিক মন্তব্য