আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ও জনগণ।

আমার গার্মেন্টস চাকরীর প্রথমদিকে। ক্লিনটন সাহেব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
মনিকা লিউন্সকির ওরালসেক্স নিয়া রীতিমত ইম্পিচমেন্টের অবস্থায় ক্লিনটন।
আমেরিকান এক ক্রেতা বন্ধুকে বললাম, ‘তোমাদের চেয়ে ভণ্ড জাতি দুনিয়াতে আরেকটা নাই।’
সে বলল, ‘কেন ?’
‘তোমরা ফ্রি সেক্সের দেশে গে ,লেসবিয়ান, অ্যানিম্যাল , ওরাল, অ্যানাল কিছুই বাদ দেও না। আর বেচারা ক্লিনটন সামান্য এক ওরালসেক্স কেসে চাকরিটা হারায় হারায় !’

উল্লেখ্য, তখন আমার এই ইয়ং ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্টকে বেশ ভালো লাগতো। যুদ্ধবাজ বুশের জায়গায় সে আসাতে আমাদের প্রজন্ম খুশিই ছিলাম।
আমেরিকান বন্ধু বলল, ‘ তোমাকে একটু বুঝিয়ে বলি। আমার ধারনা তুমি ব্যাপারটা বুঝবে।’
‘শোন জাহিদ, ধরো তুমি ব্যক্তিজীবনে উচ্ছৃঙ্খল, অনাচারী, বহুগামী, লম্পট , মাতাল অনেক কিছুই হতে পারো। তোমার পথের পথিক যারা, আশপাশের সবাইকে তুমি অবলীলায় মেনেও নিতে পারো।
কিন্তু, ধরো তোমার বাবা যিনি তোমার শ্রদ্ধার জায়গায়, তিনি যদি প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তোমার সামনে লম্পটগিরি করে, পারবে মেনে নিতে ? আমরা আমেরিকানরা নিজেরা যতোই ভণ্ডামি যতই করি না কেন , প্রেসিডেন্টকে আমরা পিতার মতো দেখি। তাঁর সামান্য স্খলনও আমরা মেনে নিতে পারি না। ’
আমি আমার উত্তর পেয়ে গেলাম।

প্রথম প্রকাশঃ ২রা এপ্রিল ২০১৩

আমেরিকার নির্বাচন ২০২০

আমি চাচ্ছিলাম ট্রাম্প ব্যাটাই আবার জিতুক।
প্রথমবার জেতার পর বিমলানন্দ পেয়েছিলাম। আম্রিকানরা সারাদুনিয়ার সবার পুটুতে আঙুল দিয়ে বেড়ায়। ট্রাম্প আসায়, নিজেদের পুটুতে, নিজেদের লোক আঙুল দিলে কেমন ব্যথা লাগে বুঝছে। এই যে আমরা বাকী দুনিয়াতে চুতিয়া সব নেতা-নেত্রীদের নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি, আমাদের ফিলিংসটা হ্লারপুতেরা বুঝুক। রাষ্ট্রনেতার মতো সর্বোচ্চ সন্মানের পদে বসে একজন যখন হুদামিছা, আউল-ফাউল কথা বলে সেটা তৃতীয় বিশ্বে একচেটিয়া হয়ে গিয়েছিল। এবার বোঝ, ঠ্যালা !

আগের ইলেকশনে ট্রাম্পকে কেন ভোট দিচ্ছ, এক সাদা আমেরিকান বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, ‘শোন জাহিদ, আমার সামনে দুইটা চয়েজ, একটা সুশীল ভণ্ড হিলারি ক্লিনটন আর আরেকদিকে পাগল-ছাগল ট্রাম্প। ভণ্ডের চেয়ে হৈহৈ রৈরৈ করা পাগল ভাল।’
এইবার সেই সাদা আমেরিকানের সঙ্গে কথাবার্তা হয় নাই।

তবে আমার মনে হয়েছে, ট্রাম্প একটা পাগলছাগল হলেও সারা দুনিয়ার পুটুতে আঙ্গুল দিয়ে বেড়ায় নাই। নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। বাইডেন সাহেব আসলে সারা পৃথিবীর বিশেষত: তৃতীয়বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের কোথায় কোন যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসবে কে জানে !
ট্রাম্পের ব্যাপারে আমার মন্তব্য, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত –টাইপ। এই লোক হাউকাউ যাই করুক তার শাসনামলে বড় ধরণের কোন ঝামেলা পাকায় নাই। না দিয়েছে মেক্সিকোর বর্ডারে দেয়াল ; না করেছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ।

কথায় বলে না, চেনা শত্রু অচেনা বন্ধুর চেয়ে অনেকসময় ভাল। কারণ, চেনা শত্রু কী কী করতে পারে, সে সম্বন্ধে একটা ধারণা তো থাকেই। কিন্তু এতোদিন পরে এই , ঘাঘুমাল বাইডেন এসে কী কী করবে কে জানে।
এনিওয়ে, সকল আম্রিকানবাসী সাদাকালোবাদামি ভাই-বেরাদারদের শুভেচ্ছা। গণতন্ত্র নিজেদের পুটুতে গেলে কেমন লাগে বোঝেন অ্যালা !

আম্রিকার ইলেকশনে আমি ও আমার প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবস্থা অনেকটা এ রকম :
বহু শতাব্দী আগে কেউ কাউকে সুসংবাদ দিলে প্রশংসা ও বখশিশ পাওয়া যেতো।তো সেটা জেনে এক লোক নাসীরুদ্দীন হোজ্জাকে গিয়ে বলল,
: ‘তোমার জন্য খুব ভালো খবর আছে, মোল্লা-সাহেব।’
: ‘কী খবর?’
: ‘তোমার পাশের বাড়িতে পোলাও রান্না হচ্ছে।’
: ‘তাতে আমার কী ?
: ‘তোমাকে সে পোলাওয়ের ভাগ দেবে বলেছে।’
: ‘তাতে তোমার কী ?’

এই যে মোবারক ওরফে বারেক ভাইয়ের পরে জয়নাল ট্রাম্প এসে আম্রিকাকে হুলুস্থূল করল। একবার মেক্সিকোর বর্ডারে দেয়াল দেয়। আরেকবার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পারমানবিক যুদ্ধ বাঁধায়। কিছু অভিযোগ করলেই মুখ বাঁকা করে বলে’ ফেইইইক ন্যুজ !’ ব্যাপারটা আমার বরাবর ভালো লাগতো।
সব সময় মনে হতো, আরে এই লোক তো আমাদের ওয়ার্ড কমিশনারের মতো উত্তর-দক্ষিণ কথা বার্তা বলে। ব্যাটাকে অনেক আপন আপন মনে হইত রে ভাই !

মোবারক ভাই বলেন আর জোবায়ের বাতেন ভাই বলেন, এদের মতো ওর কোন মিষ্টি মিষ্টি কথা নাই ; যা মনে আসতো তাই বলতো।
নির্বাচনে জিতে , আজ জোবায়ের বাতেন ভাই আর কমলা আপার সেই ‘মাপা হাসি চাপা কান্না’ দেখে মনে হচ্ছিল হলিউডের কোন সিনেমা দেখছি। খুব লম্বাচওড়া কথা ; অনেকটা আমাদের মোটিভেশনাল স্পিকাররা ইদানীং যেরকম করে দেয় আর কী! আম্রিকা হ্যান, আম্রিকা ত্যান, কিপ ফেইথ, স্প্রেড ফেইথ ইত্যাদি ইত্যাদি। মিষ্টি কথার আড়ালে আগামী চারবছরে এদের অমানবিক আগ্রাসী পুঁজিবাদের কবলে পড়ে কার কার সর্বনাশ হয় সেটাই দেখার ব্যাপার।

আমার মামার কাছে শুনেছিলাম জেনারেল জিয়ার প্রথম দিকের ইলেকশনে সবাই দলবেঁধে ধানের শীষে ভোট দিতে যেতো। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে আওয়ামীলীগ তখন সাময়িক পরবাসে, নিভু নিভু করে জ্বলছে। যে কোন সামরিক শাসকের আবার জনপ্রিয়তা থাকে ১১০% । ভোট হলে অন্য কারো ভোট খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। যাই হোক, কুষ্টিয়ার কোন এক আসনে ‘চিন্টু’ নামের  ( ডাকনাম, আসল নাম মনে নেই ) ভয়ংকর এক দুষ্টু লোক ভোটে দাঁড়িয়েছিল। কীভাবে কীভাবে যেন সে ধানের শীষ প্রতীকও ম্যানেজ করেছিল।
ভোট শেষে চিন্টু মিঞার বিজয়োৎসব শুরু হলে, এক লোক ক্ষোভে ফেটে পড়ল, ‘ভোট দিলাম ধানের শীষে, শালার চিন্টু হারামজাদা এমপি হোল কেম্মা কইরে !”

আমাদের নতুন চিন্টু মিঞা —জোবায়ের বাতেন ভাই এখন কী কী দুষ্টুমি করে সেটা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
আবারো অভিনন্দন জোবায়ের বাতেন ভাই এবং কমলা আপা ।

প্রকাশকালঃ ৫~৮ নভেম্বর,২০২০

গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ?!

গতকাল সারাটা দিন গেছে আমেরিকান গণতন্ত্র নিয়ে কূট-ক্যাচালে। ভেবেছিলাম আজ ক্ষান্তি দিই। কিন্তু আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণের সাথে কেউ একমত হোক বা না হোক, বলতে অসুবিধা কি !

১৭৬০ সাল থেকে শুরু করে আজ ২০১৬ সাল ২৫৬ বছরে গণতান্ত্রিক পথ পেরিয়েছে আমেরিকানরা।পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সর্বপ্রাচীন গণতন্ত্রের ধারক, বাহক ও প্রচারক যুক্তরাষ্ট্র। সেই তুলনায় গণতন্ত্রের পথে আমরা ভ্রূণের অবস্থানেও নিজেদেরকে বিবেচনা করতে পারি না ! পারি কি ?

মেনে নিচ্ছি, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে টেকসই রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হচ্ছে গণতন্ত্র। সমাজতন্ত্রে স্বৈরাচার তৈরি হয়ে যায় দ্রুত।সেটা আমরা অনেকবার দেখেছি। অ্যারিস্টটল-এর পছন্দ ছিল অ্যারিস্টোক্র্যাটিক অটোক্র্যাসি। রাষ্ট্র পরিচালক যদি হন দেশপ্রেমিক ও শিক্ষিত, তাহলে তাঁকে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ মঙ্গল আনয়ন সম্ভব।

আমি জানি ,অনেকেই আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসতে পারেন ! অথবা আমার উচ্চম্মন্যতা আছে বলে তাচ্ছিল্য করতে পারেন। তবুও বলি– আমি থাকি মিরপুরের অবাঙালী বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে। ভোটের সময়ে আমার বাসার সামনের বিশাল বস্তির ড্রাগ অ্যাডিক্ট উচ্ছন্নে যাওয়া রাস্তার মাস্তান আর আমার ভোটের দাম কিন্তু একই। আমি সুবিধাবঞ্চিত নই, আমি সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত—নানাভাবে আমাকে হেনস্তা করতে পারেন। কিন্তু, একজন শিক্ষিত সচেতন লোকের ভোট আর মাদকসেবীর ভোটের মূল্য কিন্তু গণতন্ত্রে একই।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার দুঃখজনক পরিণতি একটা উদাহরণ দিয়ে বছর বিশেক আগে এক মুরব্বী ব্যাখ্যা করেছিলেন। ধরেন, একটি রাষ্ট্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১০০ জন। দুই জন অযোগ্য প্রার্থীর মধ্যে একজন কুদ্দুস ভোট পেলেন ৪০টি , আরেকজন কম অযোগ্য মফিজ পেলেন ৩৫ ভাগ। বাকী ২৫ ভাগ লোকের ওই দুই প্রার্থীর কাউকেই পছন্দ নয় ! নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৪০ ভাগ লোকের সমর্থনে অযোগ্যতর প্রার্থী কুদ্দুস সরকার গঠন করল। এইখানে ট্রাজেডি হচ্ছে — ৬০ ভাগ জনগণ/ বৃহত্তম জনগোষ্ঠী কুদ্দুসকে পছন্দ করে না, কিন্তু তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই !

আমার কাছেও এইটাই মনে হয়, গণতন্ত্রের অন্যতম বড় একটা সীমাবদ্ধতা। আমেরিকার বৃহত্তম জনগোষ্ঠী তাঁদের দেশের বাইরেও যে বিশাল একটা পৃথিবী আছে , সেটাই জানে না বা কেয়ার করে না ! এঁদের মধ্যে সীমিত সংখ্যক লোকের হাইস্কুল পাস আছে। অধিকাংশই ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, কারণ সেটা তাঁদের মাতৃভাষা। এই প্রাইমারী স্কুল পাশ বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূর্খ বললে, মনে হয় না খুব বেশী অন্যায় করে ফেলব !

আমার মিরপুরে ঢাকা-১১ আসনে ৯০ এর দশকে , সংবিধান প্রণেতা ডঃ কামাল হোসেন পরাজিত হয়েছিলেন , প্রায় অশিক্ষিত জনাব হারুন মোল্লার কাছে। আবার হজ্বের তহবিল তসরুপ করা চোরা মান্নান জেতে গাজীপুরে !

[ প্রকাশকালঃ ১০ই নভেম্বর,২০১৬ ]